একবার মদিনায় এক ব্যক্তি এক পরনারীকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে বসেন! ওই ব্যক্তি কোনো সাধারণ মানুষ ছিলেন না, তিনি ছিলেন সাহাবি ও বদর যুদ্ধে অংশ নেওয়া বীর মুজাহিদ। জীবিকার তাগিদে তিনি মদিনায় খেজুর বিক্রি করতেন। নাম আবুল ইউসর কাব বিন আমর (রা.)।
অন্যদিকে, মদিনার এক নারী সাহাবির স্বামী তখন নবী কারিম (সা.)-এর হুকুমে দূরবর্তী এলাকায় জেহাদে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। পরিবারের দেখভাল ও প্রয়োজনীয় বাজার-সদাই করার জন্য ওই নারী একদিন আবুল ইউসরের দোকানে খেজুর কিনতে আসেন।
আবুল ইউসর তাকে বলেন, ‘ঘরে এর চেয়ে ভালো খেজুর আছে, আপনি ভেতরে আসুন।’ নারীটি সরল বিশ্বাসে ভেতরে প্রবেশ করতেই শয়তানের প্ররোচনায় আবুল ইউসর এক মুহূর্তের জন্য নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি, তিনি তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে বসেন!
ঘটনার পর মুহূর্তেই তিনি অনুশোচনার আগুনে জ্বলতে থাকেন। আবুল ইউসর (রা.)-এর ভেতরটা কেঁপে ওঠে। বদরি সাহাবির বিবেক তাকে দংশন করতে শুরু করে। জেহাদে যাওয়া ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে এই বিশ্বস্ততার খেয়ানত তাকে ভেতরে ভেতরে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছিল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ছুটে যান হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর কাছে। ঘটনার সব খুলে বলে পরামর্শ চাইলেন।
হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) বললেন, ‘নিজের পাপ গোপন রাখো, তওবা করো, কাউকে বলো না।’ কিন্তু সাহাবি আবুল ইউসরের বিক্ষিপ্ত মন শান্ত হলো না। তিনি ছুটলেন হজরত উমর (রা.)-এর কাছে। হজরত উমর (রা.)-ও তাকে একই পরামর্শ দিলেন- পাপ গোপন রেখে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন।
তাদের কারো পরামর্শেই যখন অন্তরের আগুন নিভল না, তখন তিনি সোজা চলে গেলেন মসজিদে নববিতে স্বয়ং হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে। কোনো রাখঢাক না রেখে, নিজের সবটুকু লজ্জা ও সম্মান বিসর্জন দিয়ে কাতর স্বরে নবীজি (সা.)-এর কাছে নিজের অপরাধের স্বীকারোক্তি দিলেন।
নবী কারিম (সা.) পুরো ঘটনা শুনলেন। তিনি সাহাবি আবুল ইউসর (রা.)-কে মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দিলেন না, সেই নারীকে ডেকে বিচারসভা বসালেন না, কিংবা কোনো কঠোর দণ্ড দিলেন না। যেহেতু ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ আসেনি, এজন্য বিচার বসেনি।
নবী কারিম (সা.) শুধু বললেন, ‘আল্লাহর পথে যুদ্ধে যাওয়া তোমার এক ভাইয়ের স্ত্রীর সঙ্গে তুমি এমন আচরণ করলে?’
নবী কারিম (সা.)-এর এই একটিমাত্র বাক্য আবুল ইউসরের বুকে তীরের মতো বিঁধল। আবুল ইউসর (রা.) এতটাই অনুতপ্ত হন যে, তার মনে হয়- তিনি যদি ওই সময় পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ না করতেন! তিনি নিজেকে জাহান্নামিদের অন্তর্ভুক্ত বলেও আশঙ্কা করতে থাকেন।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে নীরব রইলেন। এরপর আল্লাহতায়ালা অহি নাজিল করলেন, ‘আর আপনি নামাজ কায়েম করুন দিনের দুই প্রান্তে ও রাতের কিছু অংশে। নিশ্চয়ই সৎকাজ অসৎকাজকে মিটিয়ে দেয়। যারা উপদেশ গ্রহণ করে, এটি তাদের জন্য উপদেশ।’ -সূরা হুদ: ১১৪
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবি হজরত আবুল ইউসর (রা.)-কে আয়াতটি তেলাওয়াত করে শোনালেন। আয়াতের প্রসঙ্গে সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এটা কি শুধু তার জন্য, নাকি সবার জন্য?’ নবী কারিম (সা.) বললেন, ‘বরং সবার জন্য।’
ইসলামি স্কলাররা এই ঘটনা থেকে শিক্ষা হিসেবে বলেন-
১. মানুষ মাত্রই ভুল ও পাপ হতে পারে, কিন্তু মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো- পাপের পর সে তীব্র অনুশোচনায় ভোগে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসে বা খাঁটি অন্তরে তওবা করে।
২. আল্লাহতায়ালা দয়ালু ও ক্ষমাশীল। ফরজ নামাজ এবং সৎকর্ম মানুষের অজান্তে হয়ে যাওয়া ছোটখাটো পাপগুলোকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয়।
৩. নিজের এবং অন্যের গোপন পাপ মানুষের কাছে কখনোই প্রকাশ না করে আল্লাহর কাছে গোপনে তওবা করা বা এমন পরামর্শ দেওয়াই ইসলামের শিক্ষা। এর মানে এই নয় যে, অন্যের হক নষ্ট করলে তা ঠিক করার দায় থাকে না, বান্দার হক নষ্ট করলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চেয়ে নেওয়া আবশ্যক।
