রাজধানীর আধুনিক গণপরিবহনের প্রতীক মেট্রোরেল। যানজটের নগরীতে দ্রুত ও স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের জন্য এটি নগরবাসীর আস্থা অর্জন করেছে। অথচ এই আধুনিক স্থাপনা যে খুঁটিতে ভর করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেই পিলারগুলো রাজনৈতিক নেতাদের প্রচারের পোস্টার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিজ্ঞাপন, ওয়াজ-মাহফিল ও কবিরাজি চিকিৎসার বিজ্ঞাপনে ঢেকে গেছে। দেয়ালে পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণে আইন ও জরিমানার বিধান থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগের নজির দেখা যাচ্ছে না।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পিলারের নিচ থেকে আনুমানিক ১০-১২ হাত উচ্চতা পর্যন্ত পোস্টার ও ব্যানার লাগানো হয়েছে। পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার সাঁটানোর কারণে অনেক জায়গায় পিলারের স্বাভাবিক চেহারা ও বিভিন্ন নির্দেশিকা ঢেকে গেছে। দেখে মনে হয়, কে কার ওপর কত বেশি প্রচারসামগ্রী লাগাতে পারে, চলছে সেই প্রতিযোগিতা।
বাংলামোটর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও প্রেসক্লাবসংলগ্ন এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তির বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। পাশাপাশি রয়েছে নানা রঙের চটকদার পোস্টার। মিরপুর থেকে ফার্মগেট এলাকাতেও স্কুল-কলেজে ভর্তির প্রচার, ওয়াজ-মাহফিলের ঘোষণা ও কবিরাজের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে লাগানো পুরোনো পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টার যুক্ত হওয়ায় পিলারগুলোর ‘নম্বর প্লেট’ ক্রমেই বিজ্ঞাপনে ঢেকে যাচ্ছে।
শুধু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নয়, মেট্রোরেলের পিলারে রাজনৈতিক দলীয় নেতাদের প্রচারসামগ্রীরও ছড়াছড়ি। কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, আগারগাঁও, মিরপুর, প্রেসক্লাব, মতিঝিল এলাকায় নেতা-কর্মীদের নামে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন দেখা গেছে। এসব প্রচারসামগ্রীতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছবি দেখা গেছে। আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন সংলগ্ন এলাকার পিলারে বিভিন্ন সময়ের নির্বাচনি পোস্টার রয়ে গেছে।
এমনকি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী কিছু গ্রাফিতির ওপরও পোস্টার লাগানো হয়েছে। নগর সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের অংশ হিসেবে তৈরি এসব গ্রাফিতি ঢেকে যাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সচেতন মহলের অনেকে। তাদের মতে, রাজনৈতিক প্রচার কিংবা বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য এভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও স্মৃতিচিহ্নের সৌন্দর্য নষ্ট করা অনাকাঙ্ক্ষিত।
এ ছাড়া মেট্রোরেলের পিলার ও স্টেশনসংলগ্ন বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকার পাশাপাশি কোথাও কোথাও মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের অবস্থান দেখা যায়। এসব এলাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য অপসারণ ও নিরাপত্তা তদারকির ঘাটতির অভিযোগও রয়েছে।
আগারগাঁওয়ে মেট্রোরেলের একটি পিলারে পোস্টার লাগানোর সময় এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাজটিতে নিয়োজিত আব্দুল আজিজ বলেন, ‘ভাই, আমাদের এখানে লাগাতে বলেছে, তাই লাগাচ্ছি। আমাকে তারা টাকা দেবে। পিলারে পোস্টার লাগালে নাকি ভালো চোখে পড়ে, তাই লাগাতে বলেছে!’
কারা পোস্টার লাগাতে বলেছেন, জানতে চাইলে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া ঠিকানায় যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর সেখান থেকে চলে যান।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণে দেশে আইন রয়েছে। ‘দেয়াললিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২’-এর ৪ ধারায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে প্রশাসনিক আদেশের মাধ্যমে পোস্টার বা দেয়াললিখনের জন্য স্থান নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত স্থানে পোস্টার লাগানো যাবে। অন্য স্থানে লাগানোর ক্ষেত্রে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত শর্ত প্রযোজ্য হবে। একই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, ৪ ধারার অধীনে নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্য কোথাও দেয়াললিখন বা পোস্টার লাগানো যাবে না।
আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্য ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে নিজের খরচে পোস্টার অপসারণের নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। কোনো কোম্পানি বা গোষ্ঠী আইন লঙ্ঘন করলে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড এবং জরিমানা অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
সচেতন মহলের মত, আইনে শাস্তির বিধান থাকলেও মেট্রোরেলের পিলারসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনায় পোস্টার-ব্যানারের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। পোস্টারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, ঠিকানা কিংবা যোগাযোগের নম্বর উল্লেখ থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মেট্রোরেলের পিলারে পোস্টার-ব্যানার লাগানো বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কোম্পানি সচিব (যুগ্ম সচিব) আব্দুল বাতেন ফকির বলেন, ‘আমরাও চাই সৌন্দর্য বজায় থাকুক। কিন্তু আপনি আরও বেশি কিছু জানতে চাইলে আমাদের গণসংযোগ কর্মকর্তার কাছে জানতে পারেন।’
পিলারে পোস্টার-ব্যানার লাগানোর বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে কি না এবং এ নিয়ে অভিযান চালানোর প্রয়োজন রয়েছে কি না? জানতে চাইলেও তিনি সুনির্দিষ্ট উত্তর না দিয়ে গণসংযোগ কর্মকর্তা ও অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাওগাতুল আলমের সঙ্গেও একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি
নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করার বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ ও দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইন না থাকলেও পরিবেশ ও নগরের সৌন্দর্য নষ্ট করা অপরাধ! উন্নত দেশগুলোতে নগরের সৌন্দর্য রক্ষায় বাড়ির সামনের ঘাস কাটা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় রং-বেরঙের বিজ্ঞাপন, পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে যাচ্ছে। কার্যকর পদক্ষেপ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবে এসব নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে।’
তিনি বলেন, বিজ্ঞাপনের আকার, আলোকসজ্জা, পোস্টার-ব্যানারের ব্যবহার ও রঙের বিষয়ে সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। আইনেও এসব না মানলে শাস্তির বিধান রয়েছে, কিন্তু কার্যত প্রয়োগ হচ্ছে না। এই পরিকল্পনাবিদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সরকারদলীয় নেতাদের প্রচারসামগ্রী বেশি দেখা যাচ্ছে। অথচ তাদের জনস্বার্থ ও নগরের সৌন্দর্য রক্ষায় আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত তদারকি, সমন্বিত উদ্যোগ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এসব অনিয়ম নিয়ন্ত্রণ ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
