গোপনে রাজধানীর বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধন জনস্বার্থ ও শহরের বাসযোগ্যতা, পরিকল্পনা ও পরিবেশের জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করে বিতর্কিত গেজেট সম্পূর্ণ বাতিল করার দাবি জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। পাশাপাশি নদীতীরবর্তী উন্মুক্ত স্থানে শিল্প কারখানার অনুমোদন, ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) বৃদ্ধি, বন্যা প্রবাহ এলাকায় আবাসন প্রকল্প ঢাকার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলেও উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
রোববার (১৮ অক্টোবর) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড আদিল মুহাম্মদ খান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব বিষয় তুলে ধরেন।
অধ্যাপক ড আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ড্যাপ সংশোধনের নামে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং যথাযথ পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ও কারিগরি মূল্যায়ন ছাড়াই যে গেজেট অনুমোদন করা হয়েছে, সেটি অনতিবিলম্বে সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানাচ্ছে আইপিডি।
তিনি বলেন, ২০২২ সালে ড্যাপ প্রণয়নের পর চার বছরে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন সরকার- আওয়ামী লীগ, অন্তর্বর্তীকালীন ও বিএনপি সরকার- স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে শহরের পরিবেশ, বাসযোগ্যত ও টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরও আত্মবিধ্বংসী এই প্রবণতার কোনো পরিবর্তন হয়নি- বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের। পরিকল্পনা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জনস্বার্থের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যাচ্ছে একের পর এক সরকার। ব্যবসায়ীদের ইচ্ছেমতো যদি এভাবে পরিকল্পনা পরিবর্তন করা যায়, তাহলে সরকারের পরিবেশ ও পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দেবার ঘোষিত অঙ্গীকার অন্তঃসারশূন্য বলে প্রতীয়মান হবে।
আইপিডি মনে করে, ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিবর্তনের দলিল নয়। এটি ঢাকার ভূমি ব্যবহার, পরিবেশ, জনসংখ্যা, জনঘনত্ব, ট্রাফিক ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা। যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে এ ধরনের পরিকল্পনা সংশোধন করা হলে পরিকল্পিত নগর উন্নয়নের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
আইপিডির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ড্যাপের তৃতীয় দফার সংশোধন প্রক্রিয়ায় পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের ভালো-মন্দ নিয়ে নির্মোহ আলোচনা এবং কারিগরি মূল্যায়নের বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে, যেটা একবারেই অগ্রহণযোগ্য। আরও উদ্বেগজনক হলো, ড্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (রাজউক) সংশোধনের বিষয়ে অবগত নয় বলে জানা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংশোধনের সিদ্ধান্ত কী প্রক্রিয়ায়, কার সুপারিশে এবং কোন কারিগরি যুক্তিতে নেওয়া হয়েছে- সেটা প্রশ্নবোধক। ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর স্বার্থে পরিকল্পনা পরিবর্তনের অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আইপিডি মনে করে, ড্যাপের আগের সংশোধনগুলোতেও এফএআর ও ডয়েলিং ইউনিট (কাঠাপ্রতি পরিবার সংখ্যা) বাড়ানোর ক্ষেত্রে শহরের ধারণক্ষমতা, পরিবেশ-প্রতিবেশ ও জনস্বার্থের যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন ছিল। এবারের সংশোধনেও শিল্প ও আবাসন খাতের জন্য বিশেষ সুবিধা দেবার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যদি কোনো ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর দাবি বা প্রভাবের ভিত্তিতে নগর পরিকল্পনার বিধান পরিবর্তন করা হয়ে থাকে, তবে তা পরিকল্পনা প্রণয়নের পেশাগত পদ্ধতি, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শিল্প ও আবাসন ব্যবসায়ীদের বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে নগরের পরিবেশগত সুরক্ষা, অবকাঠামোগত ধারণক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি বাসযোগ্যতাকে উপেক্ষা করা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বুড়িগঙ্গার তীর, জুরাইন ও পোস্তগোলার মতো পরিবেশগতভাবে বিপন্ন এলাকায় নদী তীরবর্তী ড্যাপে চিহ্নিত উন্মুক্ত স্থানে ভারী শিল্প কারখানা স্থাপনের অনুমোদন সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কেননা বিদ্যমান শিল্প ও কলকারখানার অপরিশোধিত তরল বর্জ্য এবং রাসায়নিক পদার্থ সরাসরি নদীতে ফেলার কারণে এমনিতেই নদীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, নদীদূষণ, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা না করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা ঢাকার বাসযোগ্যতা ও পরিবেশ সুরক্ষার লক্ষ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ‘প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন, ২০০০’সহ প্রযোজ্য আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
একইভাবে, বন্যা প্রবাহ এলাকা, প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ ও জলাশয়ে আবাসন প্রকল্পের সুযোগ বাড়ানো হলে ঢাকার জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকা নগরের পানি নিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর সুরক্ষা দুর্বল করার ফলে সৃষ্ট ক্ষতি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারাও তার মাশুল দেবেন।
আইপিডির মতে, পূর্বাচলসহ পরিকল্পিত এলাকার মূল নকশায় নির্ধারিত জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কারিগরি কমিটির সুপারিশ বিবেচনা না করে বারবার এফএআর বৃদ্ধি করা হলে পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। ভবনের আয়তন বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার আগে সড়ক ও গণপরিবহন, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, অগ্নিনিরাপত্তা, উন্মুক্ত স্থান এবং পরিবেশগত ধারণক্ষমতার পর্যাপ্ততা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
আইপিডি মনে করে, পরিকল্পনা সংশোধন কোনো গোপন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। ড্যাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা সংশোধনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ, পেশাগত মতামত এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পরিবর্তন হলেও পরিকল্পনার মৌলিক লক্ষ্য ও জনস্বার্থ সংরক্ষণের নীতিতে ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। অন্যথায় পরিকল্পনা প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং নগর উন্নয়ন ব্যবসায়িক ও তাৎক্ষণিক স্বার্থের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক নগর গড়ে তোলার প্রত্যাশার বিপরীতে এ ধরনের বিতর্কিত সংশোধন জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বায়ুদূষণ, যানজট, জলাবদ্ধতা ও উন্মুক্ত স্থানের সংকটে জর্জরিত ঢাকায় নতুন করে পরিকল্পনার ব্যত্যয় এবং পরিবেশগত সুরক্ষা দুর্বল করার সিদ্ধান্ত নগরের বিদ্যমান সংকট আরও বাড়াতে পারে।
এএসএস/আরএফ
