রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় সৌরশক্তিচালিত সেচ পাম্প স্থাপনের ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় কমার পাশাপাশি ফসলের নিবিড়তা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। গত দুই বছরে স্থাপন করা হয়েছে ৩২টি সৌর সেচ পাম্প। বিদ্যুৎ ও ডিজেলনির্ভরতা কমিয়ে খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিকে টেকসই করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এ উদ্যোগ।
সরকারি উদ্যোগে সৌরশক্তিচালিত সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে রাজশাহী বিভাগের খরাপ্রবণ ও দুর্গম এলাকার কৃষিতে পরিবর্তন আসছে। ‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, কৃষকদের সেচ ব্যয় কমানো এবং পানির সাশ্রয়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে এ প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) যৌথ প্রচেষ্টায় বাস্তবায়িত এ উদ্যোগে রাজশাহী বিভাগের আট জেলার বিদ্যুৎবিহীন, খরাপ্রবণ ও দুর্গম এলাকাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মাধ্যমে বিভাগের ৬৭টি উপজেলার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সুবিধা বিবেচনায় তিন ধরনের সৌর সেচব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এগুলো হলো ফিক্সড সোলার ইরিগেশন, পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ও প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন।
ফিক্সড সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থায় ২ অশ্বশক্তির মোট ২৪টি স্থায়ী সৌর সেচ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। এসব ইউনিটের মাধ্যমে নির্ধারিত জমিতে নিয়মিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থায় রয়েছে আটটি স্থানান্তরযোগ্য ইউনিট। এগুলো এক জমি থেকে অন্য জমিতে কিংবা বিভিন্ন প্লট ও বাগানে নিয়ে গিয়ে ব্যবহার করা যায়।
অন্যদিকে, ফলবাগানের আধুনিক ব্যবস্থাপনার জন্য স্থাপন করা হয়েছে ১০টি প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন ইউনিট। প্রতিটি ইউনিট এক একর আয়তনের নির্দিষ্ট ফলবাগানের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব প্রযুক্তির জন্য জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিদ্যুৎবিহীন প্রত্যন্ত এলাকাতেও সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহসংকটের ঝুঁকিও কমছে।
বরেন্দ্র অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই খরা ও পানিসংকটের জন্য পরিচিত। এ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষিকাজে পানির দক্ষ ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রিসিশন সোলার ইরিগেশন প্রযুক্তিতে সৌরচালিত পাম্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটায় ফোঁটায় সেচব্যবস্থা। পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি গাছের গোড়ায় পানি পৌঁছে দেওয়ায় পানির অপচয় কমানো সম্ভব হচ্ছে।
এ পদ্ধতিতে গাছের শিকড়ে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং মাটির উপরিভাগের আর্দ্রতাও তুলনামূলক বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত হয়। পাশাপাশি আগাছার বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে ফলবাগানের পরিচর্যা সহজ হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ও ফলের গুণগত মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক মো. আলমগীর হোসেন জানান, আগে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে জমি ও বাগানে সেচ দিতে গিয়ে তাঁকে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হতো। উৎপাদন খরচের বড় অংশ চলে যেত সেচের পেছনে। সেচ মৌসুমে প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায়ও সমস্যায় পড়তে হতো।
তিনি বলেন, সরকারের সহায়তায় এখন সৌরশক্তির মাধ্যমে সহজেই বাগানে সেচ দিতে পারছেন। এতে সেচের খরচ ও পানির অপচয় কমেছে। গাছের পরিচর্যাও আগের তুলনায় সহজ হয়েছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান বলেন, মাঠপর্যায়ে এ প্রযুক্তির কার্যকারিতা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো খরাপ্রবণ ও পানিসংকটপূর্ণ এলাকায় জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে সৌর সেচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর পরিচালক ও কৃষিবিদ এস এম হাসানুজ্জামান বলেন, গত দুই বছরে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সৌর সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষকদের সেচ ব্যয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় গভীর নলকূপের কার্যক্ষমতা কমে গিয়েছিল। সৌরচালিত পাম্প চালুর ফলে অনাবাদি ও পতিত জমিতে বছরে তিনটি ধানসহ অন্যান্য ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ফসলের নিবিড়তা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে এসব পাম্প ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ব্যবহার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
কৃষি বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, ডিজেলচালিত পাম্পের পরিবর্তে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কৃষির উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়া যায়। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমানোরও সুযোগ তৈরি হয়। তবে বরেন্দ্র অঞ্চলে সৌর সেচের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নিশ্চিত করতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, পানির স্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং স্থাপন করা পাম্পগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সৌরশক্তিচালিত সেচ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি আরও সাশ্রয়ী, আধুনিক ও জলবায়ু সহনশীল হয়ে উঠবে। এতে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
The post সৌরশক্তিচালিত সেচে বদলাচ্ছে কৃষি, কমছে ব্যয় appeared first on ভোরের চেতনা.
