The Sangbad · সাধারণ
মহাষষ্ঠীতে উৎসবের মহাসূচনা: থিমের চমক ও ঐতিহ্যের টান
১৬/১০/২০২৬

আজ মহাষষ্ঠী। বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য এবং সর্বজনীন আনন্দের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোর আনুষ্ঠানিক সূচনার মুহূর্ত। দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে শারদোৎসবের মূল পর্ব।কলকাতার অলিগলি থেকে জেলার শহর, মফস্সল থেকে গ্রামবাংলা—সর্বত্রই এখন উৎসবের আবহ। কোথাও দেশ-বিদেশের স্থাপত্যের অনুকরণে নজরকাড়া মণ্ডপ, কোথাও শিল্পের অভিনব প্রকাশ, আবার কোথাও সামাজিক সচেতনতার বার্তা। সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে বাংলার সাংস্কৃতিক মানচিত্রে শুরু হয়েছে এক বর্ণময় অধ্যায়।২০২৬ সালের দুর্গোৎসবে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রায় ৫৭ হাজার ৫০০টি দুর্গাপুজোর আয়োজন হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকারি সূত্র। এর মধ্যে কলকাতাতেই রয়েছে ৩ হাজার ৩০০টিরও বেশি পুজো। সংখ্যার এই বিশালতা বুঝিয়ে দেয়, দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—বাংলার সামাজিক জীবন, অর্থনীতি, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই উৎসব। বড় বাজেটের নামী পুজো থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট্ট সর্বজনীন আয়োজন কিংবা বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী পুজো—প্রতিটি আয়োজনেই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।কলকাতার দুর্গাপুজোর আন্তর্জাতিক পরিচিতিও এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউনেসকো কলকাতার দুর্গাপুজোকে মানবজাতির অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সেই স্বীকৃতি এই উৎসবকে বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচিতি দিয়েছে। কারণ, কলকাতার দুর্গাপুজো মানেই শুধু প্রতিমা দর্শন নয়—এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মণ্ডপশিল্প, প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, সংগীত, মানুষের মিলন এবং শিল্পীদের দীর্ঘদিনের সৃজনশীল পরিশ্রম।এবারের পুজোয় মণ্ডপসজ্জার বৈচিত্র্যও বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। কোথাও উঠে এসেছে রাজস্থানের হাওয়া মহলের স্থাপত্য, কোথাও বিদেশের বিখ্যাত ধর্মীয় স্থাপনার আদল, আবার কোথাও বাংলার হারিয়ে যেতে বসা শিল্প ও লোকসংস্কৃতিকে নতুন করে তুলে ধরার চেষ্টা। কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কোয়ারে ‘বন্দে মাতরম’ ভাবনা ঘিরে বিশেষ আয়োজন। বাগবাজার সর্বজনীনের পুজো এবার ১০৮তম বছরে পা দিয়েছে।সেখানকার মণ্ডপে রয়েছে নিউ জার্সির স্বামীনারায়ণ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর অনুপ্রেরণা। নাকতলা উদয়ন সংঘের ভাবনায় উঠে এসেছে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’। একডালিয়া এভারগ্রিনের মণ্ডপে রয়েছে গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের আদল।শহরের অন্য প্রান্তেও রয়েছে নানা চমক। টালা পার্কের পুজোয় বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষকে কেন্দ্র করে বিশেষ ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। হিন্দুস্তান পার্ক সর্বজনীনের মণ্ডপ তৈরি হয়েছে দেশলাই কারখানার আদলে।নলিন সরকার স্ট্রিটের পুজোয় গঙ্গাদূষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা উঠে এসেছে। কুমোরটুলি পার্কের ভাবনায় রয়েছে ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন?’—যা নদী, পরিবেশ এবং মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ করে দেয়।হাতিবাগান নবীন পল্লির ভাবনায় রয়েছে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের জনপ্রিয় শিশুতোষ ছড়ার বই ‘হাসিখুশি’। আদি বাবুবাগানের পুজোয় ক্ষুধার মতো সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে ভাবনা সাজানো হয়েছে। ৭১ পল্লির মণ্ডপে প্লাস্টিকের বোতল ও বস্তার মতো উপকরণ ব্যবহারের উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব শিল্পচর্চার দিকটিও সামনে এনেছে।দমদম পার্ক ভারত চক্রে বাংলার রথের ঐতিহ্য, আর দমদম পার্ক সর্বজনীনে পুতুলনাচের মতো লোকশিল্পকে তুলে ধরার আয়োজন রয়েছে। অর্থাৎ, এবারের পুজোয় আনন্দের পাশাপাশি ইতিহাস, পরিবেশ, সামাজিক বাস্তবতা এবং বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতিও জায়গা করে নিয়েছে মণ্ডপে মণ্ডপে।উত্তর কলকাতা থেকে দক্ষিণ কলকাতা, মধ্য কলকাতা থেকে সল্টলেক—বিভিন্ন এলাকার পুজোয় দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। বেলেঘাটা ৩৩ পল্লির ভাবনায় রয়েছে পোখরান-২, সল্টলেকের এফডি ব্লকে ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ এবং বিদ্রোহী স্পোর্টিং ক্লাবের মণ্ডপে ভ্যাটিকান সিটির স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা। এই বৈচিত্র্যই কলকাতার পুজোকে অন্য মাত্রা দেয়। প্রতিটি মণ্ডপ যেন আলাদা একটি গল্প, আর দর্শনার্থীরা সেই গল্পের সঙ্গে পরিচিত হতে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ছুটে চলেন।কলকাতার বাইরেও দুর্গাপুজোর আবেদন সমান গভীর। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা, শহর, মফস্সল ও গ্রামাঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য সর্বজনীন এবং পারিবারিক পুজো। কোথাও কয়েকশো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য, কোথাও স্থানীয় শিল্পীদের হাতে গড়ে ওঠা ব্যতিক্রমী প্রতিমা, আবার কোথাও গোটা এলাকার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগে তৈরি হয়েছে উৎসবের পরিসর।বড় শহরের জাঁকজমকের পাশাপাশি এই ছোট ছোট আয়োজনও বাংলার দুর্গোৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ, দুর্গাপুজোর প্রাণ শুধু আলো ঝলমলে মণ্ডপে নয়, রয়েছে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, পাড়ার আড্ডা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে।এবারের উৎসবের সূচনাপর্বেও রয়েছে বিশেষ আয়োজন। মহালয়া উপলক্ষে কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে হয়েছিল বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। আলোকসজ্জা, ড্রোন শো, আতশবাজি, নাচ ও গানের আয়োজন ঘিরে তৈরি হয়েছিল উৎসবের আবহ। অন্যদিকে, আগের বছরগুলিতে বিসর্জনের পর রেড রোডে যে দুর্গা কার্নিভ্যাল আয়োজিত হয়েছে, এবারে তা হচ্ছে না। ফলে উৎসবের অন্যান্য আয়োজন এবং মণ্ডপের শিল্পভাবনা দর্শনার্থীদের কাছে আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি ভিড় সামলানো, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। ষষ্ঠী থেকেই বহু মানুষ মণ্ডপ দর্শনে বেরিয়ে পড়েছেন। আগামী দিনগুলিতে ভিড় আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই কারণে দর্শনার্থীদের পরিকল্পনা করে বেরোনো, প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা এবং প্রশাসনের নির্দেশ অনুসরণ করা জরুরি। বিশেষ করে বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে সঙ্গে ছাতা রাখা এবং যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা সম্পর্কে আগে থেকে জেনে নেওয়া সুবিধাজনক।মহাষষ্ঠী দিয়ে শুরু হলেও এবারের দুর্গোৎসবের দিনপঞ্জিতে রয়েছে একটি বিশেষত্ব। তিথির বিন্যাসের কারণে মহাসপ্তমী পালিত হচ্ছে ১৮ অক্টোবর। মহাষ্টমী ১৯ অক্টোবর, মহানবমী ২০ অক্টোবর এবং বিজয়া দশমী ২১ অক্টোবর। ফলে দেবীর আরাধনা, অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মণ্ডপ দর্শন ঘিরে আগামী কয়েক দিন বাংলার জনজীবন আবর্তিত হবে উৎসবকে কেন্দ্র করে।সব মিলিয়ে, দুর্গাপুজো আবারও বাংলার মানুষের কাছে নিয়ে এসেছে মিলন, সৃজনশীলতা ও আনন্দের বার্তা। কলকাতার আন্তর্জাতিক খ্যাতি, জেলার নিজস্ব ঐতিহ্য, শিল্পীদের অভিনব ভাবনা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় বাংলার দুর্গোৎসবের স্বতন্ত্র পরিচয়। দেবীর আগমনে তাই শুধু মণ্ডপ নয়, আলোয় ভরে ওঠে মানুষের মনও।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗