আমাদের দেহ কোটি কোটি ক্ষুদ্রতম একক কোষের সমন্বয়ে গঠিত। স্বাভাবিক অবস্থায় এ কোষগুলোর বৃদ্ধি ও বিভাজন চলে সুনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। কোনো কারণে দেহকোষের সুশৃঙ্খল বিভাজন অনিয়ন্ত্রিত হলে অস্বাভাবিক কোষগুলো থেকে সৃষ্টি হয় টিউমার। এ টিউমার শরীরের অন্যান্য অংশে যদি বিস্তৃতি লাভ না করে কিংবা না ছড়িয়ে পড়ে, তা হলে এটিকে বলা হয় নির্দোষ টিউমার বা বিনাইন টিউমার। পক্ষান্তরে, টিউমারটি যদি আশপাশের কলা ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গে বিস্তার লাভ করে এবং রক্তপ্রবাহ বা লসিকাপ্রবাহের মাধ্যমে দেহের অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে, তাকে বলে ক্ষতিকর টিউমার বা ক্যানসার। রক্ত বা লসিকানালি পথে সংঘটিত ক্যানসারের বিস্তারকে বলে মেটাস্ট্যাসিস। বেশির ভাগ ফুসফুসের ক্যানসারের উৎপত্তি হয় ব্রঙ্কাস বা শ্বাসনালির অন্তর্গাত্রের আবরণী কোষ থেকে (আবরক কলা)। তবে অল্প কিছু ক্ষেত্রে বায়ু কুঠুরির অভ্যন্তরীণ আবরণী কোষ থেকেও ক্যানসারের জন্ম হতে পারে। ফুসফুসের অভ্যন্তরে ক্যানসারের বৃদ্ধির ফলে দেখা দিতে পারে কাশি বা রক্তমিশ্রিত শ্লেষ্মা। হৃদযন্ত্র সন্নিহিত রক্তনালিগুলোয় কদাচিৎ বিস্তৃত হতে পারে এ ক্যানসার। লসিকানালির মাধ্যমে বিস্তৃতির ক্ষেত্রে দেখা দেয় লসিকাগ্রন্থির স্ফীতি। রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে ক্যানসারের ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে যকৃৎ, অস্থি, মস্তিষ্ক বা অপর ফুসফুস আক্রান্ত হয়।
কারণ : ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসারের সর্বপ্রধান কারণ। ফুসফুসের ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ৯০ শতাংশ ও সব ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ২০ শতাংশ ঘটে থাকে ধূমপানের কারণে। তামাকের ধোঁয়ায় থাকে ক্যানসার উৎপাদক বিভিন্ন উপাদান। ক্রমাগত ধূমপানের ফলে ফুসফুসের বায়ুপথের শ্বাসনালির, অভ্যন্তরীণ দেওয়ালের আবরক কলায় দেখা দিতে পারে অস্বাভাবিক পরিবর্তন। এ পরিবর্তিত বা অস্বাভাবিক কোষগুলো দ্রুত বিভাজিত হয়ে জন্ম দেয় ফুসফুসের ক্যানসারের। তবে ধূমপায়ী ব্যক্তি ধূমপান ছেড়ে দিলে ফুসফুসের ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। আবার যারা ধূমপান করেন না অথচ ধূমপায়ীদের সংশ্রবে থাকেন, তারাও ঘাতক ব্যাধি ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হতে পারেন। কারণ শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ওই ধোঁয়া অধূমপায়ীর নাক দিয়ে ফুসফুসে গিয়ে ক্যানসারের জন্ম দেয়। ধূমপানের ফলে অন্যান্য স্থান, যেমন- মুখ, জিহ্বা, বাকযন্ত্র বা ল্যারিঙ্কস, খাদ্যনালি ও মূত্রথলিতেও ক্যানসার হতে পারে।
উপসর্গ : এটি নির্ভর করে মূলত ক্যানসারের আকার ও অবস্থানের ওপর। রোগের প্রাথমিক অবস্থায় কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে বুকের এক্স-রে পরীক্ষায়ই এ-রোগ ধরা পড়ে। এই পর্যায়ে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রোগীর ক্যানসার ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং অস্ত্রোপচারের সাহায্যে এর চিকিৎসা সম্ভব। সচরাচর উপসর্গ হলো- স্থায়ী কাশি ও শ্বাসকষ্ট, বুকব্যথা, রক্তরঞ্জিত শ্লেষ্মা, ওজন হ্রাস, স্বরভঙ্গ ইত্যাদি। আপনার বয়স যদি চল্লিশের ওপরে হয় এবং উপরিল্লিখিত এক বা একাধিক উপসর্গ যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তা হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
চিকিৎসা : ফুসফুসের ক্যানসারের চিকিৎসা তিনভাবে করা যায়। যেমন সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি ইত্যাদি। অবশ্য তা নির্ভর করে ক্যানসারের আকার, ব্যাপ্তি ও হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার (কোষের ধরন) ওপর। কখনও কখনও একাধিক চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োজন হয়ে থাকে।
প্রতিরোধে করণীয় : ধূমপান করবেন না। যদি ধূমপান না করেন, তবে আরম্ভ করবেন না। আর যদি ইতোমধ্যে শুরু করে থাকেন, তাহলে এখনই বন্ধ করুন।
লেখক : রেডিয়েশন ও মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট এবং প্রধান, এনাম মেডিক্যাল কলেজ ও
হাসপাতাল, সাভার, ঢাকা
চেম্বার : আল-রাজী হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা
