The Sangbad · সাধারণ
সাঈদীর মামলার সাক্ষীর দাফনে বাধা, তীব্র প্রতিক্রিয়া
২৫/১০/২০২৬

পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন ঘিরে দিনভর উত্তেজনা দেখা দেয়। পরে প্রশাসনের সহযোগিতায় পুলিশ পাহারায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে তাকে গার্ড অব অনার দিতে ও দাফনে বাধা দেয়া হয়।একপর্যায়ে তার জন্য খোঁড়া কবর মাটি দিয়ে ভরাট করে ফেলা হয়।কবর খুঁড়তে কোনো পুরুষ লোক না পাওয়ায় তার বোন ও দুই মেয়ে কবর খনন করেন। দাফন সম্পন্ন হলেও নিজ এলাকায় তার কোনো জানাজা হয়নি বলে জানা গেছে। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ এ বিষয়ে নানা মন্তব্য পোস্ট করেছেন সামাজিক মাধ্যমে।সিনিয়র সাংবাদিক আনিস আলমগীর (Anis Alamgir) তার পোস্টে লেখেন, “একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশে কেন একজন ব্যক্তির মরদেহ দাফনের জন্য তার স্ত্রী, কন্যা ও বোনকে রাতের আঁধারে টর্চ জ্বালিয়ে কবর খুঁড়তে হবে? দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার বাদী বা সাক্ষী হওয়ার কারণে কি মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর শান্তিতে সমাহিত হওয়ার কিংবা ধর্মীয় মর্যাদা অনুযায়ী সঠিক জানাজা পাওয়ার অধিকারটুকুও নেই?অতীতে প্রশাসন যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফাঁসি কার্যকরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও উত্তেজনা এড়াতে নিজ দায়িত্বে দাফনের ব্যবস্থা করেছিল। তবে আজ কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থার এই দুর্বলতা ও ব্যর্থতা দৃশ্যমান? নাগরিক হিসেবে শান্তিতে মৃত্যুর এবং দাফনের অধিকার কি তবে হরণ হয়ে যাবে?”সিনিয়র সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না (Monjurul Alam Panna) তার পোস্টে লেখেন, “প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা সেটি ভরাট করে দেয়। পরে রাতে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মেয়ে ও দুই বোন মোবাইল ফোনের আলোয় আবার কবর খুঁড়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন। মুক্তিযোদ্ধা মানিকের অপরাধ ছিল- তিনি দেলোয়ার হুসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদি ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিএনপি সরকারের স্লোগান আমাকে সত্যি সত্যিই শিহরিত করে...!! মানিক পশারীর জন্য তাদের কোন ধরণের বিকার না থাকলেও জুলাই যোদ্ধা হাদির কবর জিয়ারতে ছুটে যান তারেক রহমান। ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল...”সিনিয়র সাংবাদিক নাজনীন মুন্নী (Naznin Munni) লেখেন, “মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রয়াত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগকারী মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার মরদেহ দাফন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে গার্ড অব অনার প্রদান ও পিরোজপুরে দাফনে বাধা সৃষ্টি করেন।মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর নিজ বাড়িতে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানীয় কিছু জামায়াত নেতাকর্মী ও সমর্থক আবারো জড়ো হয়ে বাধা দেন। এমনকি কবর খুঁড়তে লোকও যেতে পারেনি সেখানে। পরে ৪ ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকে বাড়ি উঠানে মানিক পশাকীতে দাফন করে তার পরিবার।”ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে উদ্যোক্তা, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও প্রকৃতিবিষয়ক গবেষণা পরামর্শক সিরাজুল হোসেন (Abm Sirajul Hossain) লেখেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যুর পর শয়তানবাদীদের ভয়ে স্বজন ও গ্রামবাসীকে পাশে না পেয়ে শেষ বিদায়ের আয়োজনে মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগমকে খুঁড়তে হয়েছে ভাইয়ের কবর। মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগম বলেন, রাতে প্রশাসন অনুমতি দেওয়ার পর ভাইয়ের মেয়ে শিমুকে নিয়ে মোবাইলের আলো জ্বেলে কবর খুঁড়তে শুরু করি। এলাকার কেউ এগিয়ে আসেনি। গভীর রাতে অন্ধকারের মধ্যে আমরা কবর খুঁড়েছি। আল্লাহর ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত আমার ভাইয়ের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।’শনিবার সকালে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মারা যান ৮৭ বছর বয়সী মানিক পশারী। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাস ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিজ এলাকা ছেড়ে টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাতার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর পর দুপুর ১২টার দিকে তার মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।শত মিথ্যা ও ক্ষমতায় শয়তানবাদীরা নিজেদের চেহারা ঢেকে রাখতে চাইলেও সেটা ফুটে ওঠে। কারবালায় শয়তানবাদী এজিদ কতৃক নিহত নবীর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এবং তাঁর পরিবারের সদস্য ও অনুসারীদের কবর দেয়নি এজিদ। তখনও কিন্তু মহানবী হযরত মুহাম্মদ এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন এর বোন জয়নবকে ভাইয়ের কবরের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। ইতিহাসের এমন মিল একটি ঐশ্বরিক বার্তা দেশের জনগণের প্রতি - যে শয়তানের খপ্পরে পড়ে গেছে তারা। .....”ঢাকা সাব এডিটরস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন ইমন (Zakir Hossain Emon) তার পোস্টে লেখেন, “জামাত-শিবিরের মবের ভয়ে গ্রামের মানুষ আসতে পারেনি মানিক পশারীর জানাজায় ও কবর খুঁড়তে। এই জামাত শিবির যখন মরবে তখন কি আসতে পারবেন গ্রামের সাধারণ মানুষ? চাঁদে থাকা সাঈদী তখন পাঠাতে পারবেন তো তার জঙ্গি বাহিনী। পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর কবর খুঁড়ছেন তার স্ত্রী, বোন ও কন্যা।”মাছরাঙা টিভির ব্রডকাস্ট সাংবাদিক ফারদিন ফেরদৌস (Fardeen Ferdous) লেখেন, “মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর প্রতি চরম প্রতিহিংসা দেখিয়েছে একাত্তরে পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। ভাগ্যচক্রে তারা এখন ক্ষমতার দ্বিতীয় প্লেসে আছে তাই এই অবস্থা। তারা যখন বেহেশতের টিকিট বিক্রি করতে করতে ক্ষমতার ভরকেন্দ্রে চলে যাবে -তখন এই দেশে তারা ছাড়া ভিন্নমতের একটা মানুষও টিকতে পারবে না। যাহোক আমাদের খুশি হওয়াই উচিত -কয়েকজন নারী তাদের স্বজনের কবর খুড়েছেন এবং সমাধিস্থ করায় ভূমিকা রাখতে পেরেছেন। ধর্মীয় রিচুয়ালটা বদলে দেয়ায় প্রতিহিংসাপরায়ণদের ভূমিকার প্রশংসা করা যায়?দৈনিক সমকালে পরিবেশিত আজকের খবর থেকে জানা যাচ্ছে, ‘প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা সেটি ভরাট করে দেন। পরে রাতে মানিক পশারীর মেয়ে ও দুই বোন গ্রাম পুলিশের সহায়তায় মোবাইল ফোনের আলোয় আবার কবর খুঁড়ে দাফনের ব্যবস্থা করেন।’আমার ভাই এহসানুল হক খান আশীষ লিখেছেন, ‘মানুষ মরে যাওয়ার পর আর কিছু থাকে না। কারো জানাজা এবং দাফনে বাধা দেওয়ার অধিকার ধর্ম কিংবা রাষ্ট্র কাউকে দেয় নাই। তাছাড়া, জানাজা ও দাফন মৃত ব্যক্তির উপরে আবশ্যক নয় বরং সমাজের মানুষের জন্যে ফরজে কিফায়া। তাছাড়া, তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তার রাষ্ট্রীয় স্যালুট পাবার কথা। সব মিলিয়ে এইটা অমানবিক, অনৈসলামিক ও অরাষ্ট্রীয় কাজ হয়েছে। এই ঘটনায় প্রতীয়মান হয়েছে ওই অঞ্চলে কোনো মানুষ নেই এবং সরকারও নেই! যারা রয়েছে সব ধর্মান্ধ এবং অমানুষ! কিছু ভীতুর ডিমও থাকতে পারে। যাই হোক, এই ব্যর্থতার দরুণ সরকারের উচিত ওই অঞ্চলের ইউএনও কে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা। আর, রাতের বেলায় দুই নারী কবরস্থানে গিয়ে কবর খুঁড়ে লাশ দাফন করলো- এতে ওই অঞ্চলের মোল্লা মৌলবিরা কি জবাব দেবেন? মহিলা মানুষ কবরস্থানে গিয়ে পবিত্রতা নষ্ট করেছে! পাপ করেছে! তার আগে বলেন কুরআনের কোথায় আছে মুসলিম দূরে থাক কোনো অমুসলিম কাফের বা নাস্তিকের লাশ দাফনে বাঁধা দেওয়া যাবে? এটাকে ইসলাম বলে! ভন্ডদের ভন্ডামির বিরুদ্ধে এখনই রুখে না দাঁড়ালে ভবিষ্যতে লড়াইটা আরো কঠিন হয়ে পড়বে। ”মাছরাঙা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিনিধি জাহেদ সেলিম লেখেন, “যে চোখে থাকার কথা শোকের অশ্রু, সেই চোখের সামনেই খুঁড়তে হচ্ছে আপনজনের শেষ আশ্রয়। কবর দিতে বাধা, তাই কোদাল হাতে কবর খুঁড়ছেন বোন আর মেয়ে। মৃত্যুর পর মানুষের চাওয়া তো একটুকরো মাটি, স্বজনদের শেষ বিদায়। সেই অধিকারটুকুও যখন কেড়ে নেওয়া হয়, নিষ্ঠুরতার আর কতটা বাকি থাকে?বিহারের পাটনার আমির আজিজের ‘সব মনে রাখা হবে’ কবিতার কথা মনে পড়ল।......যখনই জগতে কাপুরুষতার কথা উঠবে, তোমার অপকর্মের কথা মনে রাখা হবেযখনই জগৎ বলবে, কাকে বলে বাঁচা, আমাদের কথা মনে রাখা হবেকিছু মানুষ তো ছিল, যাদের সংকল্প ভাঙতে পারেনি লোহার হাতকড়াকিছু মানুষ তো ছিল, যাদের বিবেক কিনতে পারেনি ইজারাদারের কড়িকিছু মানুষ তো ছিল, যারা দাঁড়িয়ে ছিল নুহের প্লাবন হওয়ার পরওকিছু মানুষ তো ছিল, নিজের মৃত্যুসংবাদের পরও বেঁচে ছিল যারাপলক ভুলে যাক চোখকে ঢাকার কথাপৃথিবী যাক ভুলে অক্ষপথে ঘোরামনে থাকবে আমাদের কাটা ডানার ওড়ামনে থাকবে এই স্লোগান আমাদের এই ভাঙা গলাসারা জীবন যেন দেওয়া যায় তোমাদের নামে অভিসম্পাতকলঙ্ক যেন লেপন করা যায় মূর্তিতে তোমাদেরতোমাদের নাম তোমাদের ভাস্কর্য টিকিয়ে রাখা হবেসবকিছু মনে রাখা হবেসব মনে রাখা হবে, সব”ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রভাতফেরী’র কর্মশালাবিষয়ক সম্পাদক ফাতেমা তুজ জোহরা (Fatema Tuz Zohora) তার পোস্টে লেখেন, “ইতিহাস হয়ে রয়ে গেল এক বিষাদের রাত। Bangladesh Nationalist Party-BNP মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দল।Part of joke of our nation. This shall too pass.Every debt will be paid off.”
মূল প্রতিবেদনে যান ↗