রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মাছের আড়ত থেকে চাঁদাবাজি করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তবে এই গ্রেপ্তারের পর রাজধানীজুড়ে ও তার নিজ এলাকা আদাবরে নগ্ন চাঁদাবাজি, জোরপূর্বক উন্নয়নকাজের ঠিকাদারি হাতিয়ে নেওয়া এবং বাড়ি দখলের মতো একাধিক গুরুতর অপরাধের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) গোয়েন্দা পুলিশ কর্তৃক নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তারের সংবাদ প্রকাশের পর আদাবরের মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, ছাত্রদলের নাম ভাঙিয়ে নয়ন ও তার সহযোগীরা দিনের পর দিন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
ঘটনার বিস্তারিত সময়রেখা ও স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের একটি বিশেষ দল কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে অভিযান চালিয়ে আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেনকে হাতেনাতে আটক করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে কারওয়ান বাজারের চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তবে এই গ্রেপ্তারের খবর আদাবর এলাকায় পৌঁছানোর পর মনসুরাবাদ হাউজিং এলাকার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তার ও তার অনুসারীদের বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে মুখ খুলতে শুরু করেন।
স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থেকে জানা যায়, বর্তমানে আদাবর মনসুরাবাদ হাউজিংয়ের ৬ নম্বর সড়কে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ব্যবস্থাপনায় রাস্তা ও ড্রেনেজ সংস্কারের চলমান উন্নয়নকাজ চলছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নয়ন ও তার অনুসারীরা ওই সড়কের প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি ভবনের পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইনের কাজ নিজস্ব লোক দিয়ে করার জন্য ভবনমালিকদের ওপর তীব্র জোরজুলুম ও চাপ প্রয়োগ করেন। কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর প্রতিটি বাড়ি থেকে ২০ হাজার থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ও অযৌক্তিক বিল দাবি করে তা জোরপূর্বক আদায় করা হয়।
৬ নম্বর সড়কের ৬৯ ও ৭০ নম্বর ভবনের নালার কাজের জন্য একতরফাভাবে ৫৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। ভবনমালিকরা স্থানীয় ও অভিজ্ঞ মিস্ত্রি দিয়ে নিজ খরচে কাজ করতে চাইলে চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত নিজেদের ছাত্রদল নেতা নয়নের লোক পরিচয় দিয়ে তাতে বাধা দেয়। নির্ধারিত অতিরিক্ত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই বাড়িমালিককে প্রকাশ্যে নানা ধরনের প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করেন। একই সড়কের অন্য একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাধারণ কোনো মিস্ত্রি দিয়ে যে কাজ মাত্র ১০ হাজার টাকায় সম্পন্ন করা সম্ভব ছিল, সেখানে বিভিন্ন কৌশলে তিন ধাপে জোরপূর্বক ২৩ হাজার ৫০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কেবল সিটি করপোরেশনের উন্নয়নকাজে চাঁদাবাজিই নয়, বরং আদাবর থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক নয়ন হোসেন এবং সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিমের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে এলাকার বিভিন্ন এমব্রয়ডারি কারখানা, ফুটপাতের ক্ষুদ্র দোকান এবং নির্মাণাধীন বহুতল ভবনগুলো থেকে নিয়মিত মাসোহারা ও চাঁদা আদায় করা হতো। এমনকি গত বছরের (২০২৫ সাল) ২৫ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় আদাবর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম বাবুলের একটি আবাসিক বাড়ি জোরপূর্বক দখলের চাঞ্চল্যকর চেষ্টা চালায় নয়নের ক্যাডার বাহিনী। ওই সময় বাড়িটি দখলে ব্যর্থ হয়ে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়। ঘটনাস্থলের ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা (সিসিটিভি) ফুটেজে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন স্থানীয় শীর্ষ নেতাকে হামলার সময় সক্রিয়ভাবে উপস্থিত থাকতে দেখা গিয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ ও অভিযুক্তদের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করলে ঘটনার ভিন্নমুখী বক্তব্য ও রাজনৈতিক রেষারেষির চিত্র স্পষ্ট হয়। অভিযুক্ত ছাত্রদলের সদস্যসচিব মনিরুজ্জামান মজুমদার জসিম তার বিরুদ্ধে আনীত চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের সমস্ত অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি কেবল একটি বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলো তার বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এদিকে গত মাসে মিরপুরের একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে রক্তক্ষয়ী হামলার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের অধীন আদাবর থানা কমিটি ইতিমধ্যে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক আকরাম আহমেদ দাবি করেন, নয়নকে আদাবরের এলাকা থেকে আটক করার কথা বলা হলেও পরবর্তীতে তাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অভিযোগে কারওয়ান বাজারের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যা এক ধরনের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
আইনগত পদক্ষেপ ও প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ গণমাধ্যমকে জানান, কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বিবেচনায় নয়, বরং সুনির্দিষ্ট প্রমাণ, তথ্য-উপাত্ত ও অভিযোগের ভিত্তিতেই নয়ন হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বর্তমানে নয়নের বিরুদ্ধে আদাবর থানাধীন এলাকায় পূর্বে ঘটে যাওয়া চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় অন্য কারও নাম বা অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
আইনি ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে চাঁদাবাজি ও পেশিশক্তি প্রদর্শন বাংলাদেশের স্থানীয় অর্থনীতি এবং নাগরিক নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে। ‘পেনাল কোড, ১৮৬০’-এর ৩৮৩ ও ৩৮৪ ধারা অনুযায়ী জোরপূর্বক অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজি একটি অদম্য ও গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। রাজনৈতিক দলগুলোর পদ-পদবি ব্যবহার করে এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। গোয়েন্দা পুলিশের এই অভিযানের ফলে আদাবর ও কারওয়ান বাজার এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের মধ্যে সাময়িক স্বস্তি ফিরে এলেও, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত নেপথ্য নায়কদের আইনের আওতায় আনার দাবি জোরালো হয়েছে।
