কখনো কালো পোশাক, সঙ্গে এসআরবির ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তুলে নেওয়া, পরে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রেমবাজার থেকে ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা পুলিশ।
বুধবার (২১ অক্টোবর) কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকা থেকে তাকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, চক্রটির নেতৃত্বে ছিলেন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি। তার বিরুদ্ধে ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে অপরাধ সংঘটনের ঘটনায় ১৩টি মামলার তথ্য পেয়েছে পুলিশ। সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে তথ্য সরবরাহ এবং অপহরণের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনায় অন্য সদস্যরা সহযোগিতা করতেন বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ির প্রেম বাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে বসে ছিলেন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসান। এ সময় কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা জ্যাকেট, মাথায় কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি দোকানে প্রবেশ করেন। তারা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দিয়ে ব্যবসায়ীর যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে তার পরিচয় নিশ্চিত করেন।
একপর্যায়ে ব্যবসায়ী নিজের পরিচয় দিলে তারা তার দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরান। এরপর টানাহেঁচড়া করে তাকে দোকান থেকে বের করে একটি অজ্ঞাত সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নিয়ে যান। পরে বিভিন্ন যানবাহনে স্থানান্তর করে তাকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর, ওই দিন রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। ফোনে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ব্যবসায়ীকে হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ব্যবসায়ীর ভাই মো. হোছাইমের এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা করা হয়।
যেভাবে উদ্ধার অভিযান
ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের দিকনির্দেশনায় অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধার এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে মাঠে নামে ডিবি ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ। সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে।
এর ধারাবাহিকতায় কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোর চারটার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।
অভিযানে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, পাঁচটি কালো রঙের এসআরবি লেখা জ্যাকেট, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বাসিন্দা চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার মিজানুর রহমান, উখিয়া উপজেলার জয়নাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদর উপজেলার দেলোয়ার হোসেন।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সুমন মুন্সি আগে উখিয়া এলাকায় র্যাবে কর্মরত ছিলেন। সে সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত হওয়া ও কারাভোগের পর তিনি বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি দল গড়ে তোলেন।
তিনি আরও বলেন, আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর সুমন ও তার সহযোগীরা ভুয়া এসআরবি পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন।
পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা রয়েছে। ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।
এমআর/জেআই
