২০১০ সালে আরো ১৪টি কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। দুই দফায় নির্মিত ২৪টি কেন্দ্রের অধিকাংশেই নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি।
সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসা দিয়ে প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল ২৪টি ট্রমা সেন্টার। দুই দফায় এসব কেন্দ্রের অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে অন্তত ১৪০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রায় দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো কেন্দ্রই পূর্ণাঙ্গ ট্রমা সেবা দিতে পারছে না। কোথাও সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ চালু আছে, কোথাও ভবন ব্যবহার হচ্ছে অন্য কাজে, আবার অধিকাংশই জনবল ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে কার্যত অকার্যকর। এদিকে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বাড়ছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এসব কেন্দ্রের কার্যকারিতা ও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ব্যক্তির চিকিৎসায় বিলম্ব হলে মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, মাথা ও বুকে আঘাত কিংবা হাড় ভাঙার মতো ক্ষেত্রে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। মহাসড়কের কাছাকাছি ট্রমা সেন্টার থাকলে আহত ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং প্রয়োজন হলে উন্নত হাসপাতালে পাঠানো সম্ভব।
এ লক্ষ্যেই ২০০৪-০৫ অর্থবছরে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কের পাশে প্রথম পর্যায়ে ১০টি ট্রমা সেন্টার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ২০১০ সালে আরো ১৪টি কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। দুই দফায় নির্মিত ২৪টি কেন্দ্রের অধিকাংশেই নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে মাত্র দুটি কেন্দ্রে সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগের সেবা চালু রয়েছে। আরেকটি কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট জেলা হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বড় বড় সড়ক ও মহাসড়ক নির্মিত হলেও সড়কে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। এ কারণে প্রতি বছরই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। যাত্রীদের স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে এগুলোর কার্যক্রম শুরু হয়নি। এখন সরকার এগুলো চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে, যা ইতিবাচক। এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা পাওয়ার অন্তত একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।’
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি ট্রমা সেন্টারে সাতজন কনসালট্যান্ট, তিনজন অর্থোপেডিক সার্জন, দুজন অ্যানেসথেসিস্ট ও দুজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা ছিল। পাশাপাশি ১০ জন নার্স এবং ফার্মাসিস্ট, রেডিওগ্রাফারসহ প্রয়োজনীয় কারিগরি জনবল থাকার কথা। কিন্তু প্রস্তাবিত জনবল কাঠামো অনুযায়ী নিয়োগ না হওয়ায় অধিকাংশ কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু করা যায়নি। অনেক কেন্দ্রে জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামও নেই।
দুই দফায় নির্মিত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিশোরগঞ্জের ভৈরব ট্রমা সেন্টার অন্যতম। কেন্দ্রটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, জনবল নিয়োগ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে এখনো পূর্ণাঙ্গ সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
একই পরিস্থিতি সুনামগঞ্জের ছাতক ট্রমা সেন্টারেও। জেলার সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ জানান, স্থায়ী জনবল না থাকায় কেন্দ্রটির সেবাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকরা সেখানে কিছু সেবা দিয়ে থাকেন।
মহাসড়কে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা পেতে বিলম্বের ঝুঁকি কতটা, তার অন্যতম উদাহরণ ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা। হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত নয় মাসে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভাঙ্গা উপজেলার সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের নাদিম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ট্রমা সেন্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সচল থাকলে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিরা দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা পেতেন। ভাঙ্গা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ কেন্দ্র। এখানে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও বেশি ঘটে। এ এলাকায় একটি ট্রমা সেন্টার নির্মাণ করা হলে আহতরা দ্রুত সেবা পাবেন।’
ট্রমা সেন্টারগুলোকে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে না পারলে সেখান থেকে কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্তক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ এবং গুরুতর রোগীকে উন্নত হাসপাতালে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। এজন্য ট্রমা সেন্টারগুলোর সঙ্গে নিকটবর্তী জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সমন্বয়ও জরুরি।’
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর থাকা ট্রমা সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করে ‘অ্যাক্সিডেন্ট অ্যান্ড ইমার্জেন্সি ট্রিটমেন্ট সেন্টার’ নামে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, পুরনো ট্রমা সেন্টারগুলো আধুনিকায়ন করে নতুন নামে চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করে পর্যায়ক্রমে দ্রুত সেবা চালু করা হবে।
ট্রমা সেন্টারগুলো চালুর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. ফোয়ারা তাসনিম বণিক বার্তাকে জানান, ‘আমরা এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছি, খুব দ্রুতই এসব সেন্টারের কার্যক্রম শুরু করা হবে, শুধু সেন্টারই নয়, মহাসড়কগুলোতে প্রতি ১০ কিলোমিটার পর পর অ্যাম্বুলেন্স থাকবে। যাতে দুর্ঘটনা ঘটলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে আহতদের সেবা দেয়া যায়।’ একই সঙ্গে নতুন একাধিক ট্রমা সেন্টার নির্মাণের জন্য কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানান তিনি।
