নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ প্রায় চার মাস ধরে বিচারক নেই। এতে আদালতটির বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক এবিএম গোলাম রসুলকে ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হলেও তার বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় অনীহার অভিযোগ উঠেছে। এতে নীলফামারী সদর, জলঢাকা ও সৈয়দপুর উপজেলার বিচারপ্রার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ধর্ষণসহ নারী ও শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন মামলার বিচার ও সাক্ষ্য গ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, নীলফামারীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক জিয়াউদ্দিন মাহমুদ গত ২৩ জুন জেলা ও দায়রা জজ পদে পদোন্নতি পেয়ে বদলি হয়েছেন। এরপর নতুন বিচারক পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক এবিএম গোলাম রসুলের ট্রাইব্যুনাল-১-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্ব পালনের কথা। তবে বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত বিচারকের কাছে জামিনের আবেদনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিকার চাইতে গিয়ে তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের আবেদন গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কুড়িগ্রাম জেলা থেকে আসা বিচারপ্রার্থী মো. আখতারুল আলম বলেন, ‘আমার জামাই ও ভাতিজা দীর্ঘ পাঁচ মাস ধরে কারাগারে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের জামিনের আবেদনের জন্য নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এ গেলে পেশকাররা ফাইল নেন না। তারা বলেন, ট্রাইব্যুনাল-২ এর স্যার এসব জামিনের আবেদন দেখবেন না। জামিন হবে কি হবে না, সেটা পরের বিষয়। অন্তত আবেদনটি দেখার মতো কেউ নেই বলে তিনি জানান।’
নীলফামারী সদর উপজেলার সোনারায় সাতারুপাড়ার মহির উদ্দিন বলেন, ‘ওই আদালতে বিচারক না থাকায় আমার ছেলের জামিন নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। দায়িত্বরত ভারপ্রাপ্ত বিচারক আমাদের জামিনের ফাইল দেখতে চান না। অনেকবার চেষ্টা করার পর একদিন সবকিছু দেখে পরে তিনি জামিন দিয়ে দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ২ থেকে ১৮ই জানুয়ারী ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক হিসেবে মো. আসাদুজ্জামান খান পদায়ন হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৮ দিন এবং ২০২৫ সালের ২১ রমজানে ছুটিতে বাড়ি যাওয়ায় ১৩ দিন, এরপর আবার হজে যাওয়ায় টানা ৪৩ দিন আদালতটিতে কোনো বিচারক ছিলেন না বলে জানা গেছে।
জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২৩ জুন পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল-১ এ তিনজন বিচারক বদলি হয়েছে। ওই সময়ও এবিএম গোলাম রসুল ভারপ্রাপ্ত বিচারকের দায়িত্বে থাকলেও ট্রাইব্যুনাল-১ এর কোনো বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে অনেক বিচারপ্রার্থীকে ইদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় বিনা বিচারে কারাগারে কাটাতে হয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের পরিবারের অভিযোগ।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) আসাদুজ্জামান খান রিনোও ভারপ্রাপ্ত বিচারকের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনীহার অভিযোগ করেছেন।
তিনি বলেন, ‘ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব প্রাপ্তির পর বিচারকাজ পরিচালনার জন্য আমি প্রস্তুত থাকলেও এবিএম গোলাম রসুল স্যার কোনো ফাইলিং, জামিনের আবেদন, আপসের সাক্ষী বা অন্য কোনো সাক্ষী গ্রহণ করেন না। এক কথায়, তিনি বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নেন না।’
পিপি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারপ্রার্থীরা দূরদূরান্ত থেকে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে অভিযোগও দেওয়া হয়েছে। পরে আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও নীলফামারী-২ আসনের সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতিফ, সাধারণ সম্পাদক আল মাসুদ চৌধুরীসহ সমিতির অনেকে ভারপ্রাপ্ত বিচারককে বিচার কার্যক্রম পরিচালনার অনুরোধ জানান। তবে ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক এবিএম গোলাম রসুল স্যার বিচার পরিচালনায় অপারগতা প্রকাশ করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারক এবিএম গোলাম রসুল বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে পারব না। গণমাধ্যমে কথা বলতে হলে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি নিতে হবে।’
