সুপ্রিম কোর্ট। ছবি: Ei Samay
Published on
:
4 min read
এই সময়, নয়াদিল্লি: ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) প্রতিবাদ কর্মসূচিকে রুখতে গিয়ে দিল্লিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করা যাবে না, বন্ধ করা যাবে না ৫৭টি মেট্রো স্টেশন— দু’দিন আগে এমনই নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ। তারপরেও শনিবার যে ভাবে গোটা দিল্লিকে ব্যারিকেডে মুড়ে, ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে, রাজধানীর একাংশে কার্যত লকডাউন করে দিল্লি পুলিশ রুখেছে ককরোচদের আন্দোলন— তাতে শীর্ষ আদালতের আদেশ অমান্য হয়েছে বলে অভিযোগ তুলে ফের সুপ্রিম কোর্টে মামলা হয়েছিল।
রবিবার ছুটির দিনে তাই বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ জরুরি ভিত্তিতে এই মামলার শুনানি করে স্পষ্ট জানিয়ে দিল— মেট্রো এবং ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ইন্টারনেট পরিষেবাও চালু করতে হবে৷ একইসঙ্গে দিল্লির সর্বত্র যানবাহন চলাচল অবাধ রাখার লক্ষ্যে যত্রতত্র বসানো পুলিশি ব্যারিকেড নিয়েও পর্যালোচনা করতে হবে৷ আদালতের স্পষ্ট বক্তব্য— শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের জন্য কেউ জমায়েত করলে কাউকেই বেআইনি ভাবে আটক করা যাবে না৷ কেন্দ্রীয় সরকার, দিল্লি পুলিশ এবং দিল্লি মেট্রোর বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তলব করেছে শীর্ষ আদালত৷ আগামিকাল, মঙ্গলবারের মধ্যে তাদের জানাতে হবে, কেন তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করা হবে না৷
এ দিনের শুনানিতে বেঞ্চ বুঝিয়ে দিয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার নামে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ এবং রোজকার জীবন অচল করে দেওয়া কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আজ, সোমবার দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার কথা বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রতিনিধিদের। ভোটার লিস্টে বিশেষ নিবিড় সংশোধন (সার) বাতিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের সাসপেনশনের আর্জি সমেত বেশ কয়েকটি মামলা চলছে সিজেআইয়ের বেঞ্চেই। তার আগে যে ভাবে শনিবার যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ সামাল দিতে রাজধানী দিল্লিকে অচল করে ফেলা হয়েছিল— সেই ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এ দিন বিচারপতি বাগচী এবং বিচারপতি মোহনার বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছে, শীর্ষ আদালতের বাইরে থাকা বিএনএসএসের ১৬৩ নম্বর ধারার (পূর্বতন সিআরপিসির ১৪৪ ধারা) বোর্ডটি সরিয়ে ফেলতে হবে। যাতে ন্যায়বিচারের পথে কোনও রকম বাধাসৃষ্টি না হয়। বিচারপতি মোহনা বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা যেতে পারে। তবে আইনভঙ্গ করা যাবে না।’ বিচারপতি বাগচীর পর্যবেক্ষণ, ‘আমরা যে নির্দেশ দিয়েছিলাম, তার প্রেক্ষিতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা মঙ্গলবারের মধ্যে রিপোর্ট দিয়ে জানাতে হবে।’
শনিবার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করা সাধারণ নাগরিকদের উপরে অত্যাচার করেছে দিল্লি পুলিশ, বেআইনি ভাবে অনেককে আটক করা হয়েছে— এ দিনের শুনানিতে অভিযোগ করেন বর্ষীয়ান আইনজীবী কপিল সিবাল৷ আইনজীবী শাদান ফারাসাতের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করার সময়ে সুপ্রিম কোর্টের সামনে থেকে তাঁকেও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় পুলিশ৷ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পরিচয় দেওয়ার পরেও দিল্লি পুলিশ তাঁকে রেয়াত করেনি৷ সিবাল বলেন, ‘সংবিধানে নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ ভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারীদের নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে পৌঁছতেই দেওয়া হয়নি। টেনেহিঁচড়ে তোলা হয়েছে প্রিজ়ন ভ্যানে। অনেককে অবৈধ ভাবে আটক করে পুলিশ। ট্রেন থেকে সাধারণ মানুষকে পর্যন্ত তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দিল্লিতে এখনও চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে।’ মামলাকারীদের তরফে আর এক বর্ষীয়ান আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণনের মন্তব্য, ‘রাজধানী দিল্লি পুলিশ স্টেট হয়ে গিয়েছে।’
কালীঘাট–তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ তথা মামলাকারীদের আর এক আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বলেন, ‘সাংসদদের বাড়ির সামনেটাও ব্যারিকেড করে আটকে দেওয়া হয়েছে। চার জন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এবং সাংসদদেরও আটক করে সারা শহর প্রিজ়ন ভ্যানে ঘোরানো হয়েছে। অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। আইন অনুযায়ী দেশে জরুরি অবস্থা ছাড়া কখনও সংবিধান স্বীকৃত প্রতিবাদ, শান্তিপূর্ণ মিছিলের অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।’ তাঁর আর্জি— ‘যে সব আধিকারিক সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হোক।’ প্রবীণ আইনজীবী কেকে বেণুগোপালও বলেন, ‘আমার এক প্রাক্তন জুনিয়রকে পুলিশ ভ্যানে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁকে ঘটনাস্থল থেকে প্রথমে ন’কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে আরও ১১ কিলোমিটার দূরে নামিয়ে দেওয়া হয়।’
এই সব যুক্তির প্রেক্ষিতে বিচারপতি বাগচী বলেন, ‘এই হেবিয়াস কর্পাস সংক্রান্ত আবেদনের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে স্পষ্ট করতে হবে— কোন পরিস্থিতিতে, কী ভাবে এবং কী যুক্তিতে এই আটক করা হয়েছে।’
কেন্দ্রের সলিসটর জেনারেল তুষার মেহতা মামলাকারীদের যুক্তি খারিজ করে জানান, শনিবার রাত ১০টার মধ্যে সমস্ত মেট্রো স্টেশন আবার খুলে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট পরিষেবাও স্বাভাবিক হয়েছে। তাঁর যুক্তি, পুলিশের অনুমতি না–নিয়েই এই কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছিল। আইনজীবীদের তরফে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে যে হেনস্থার অভিযোগ করা হয়েছে, সেই বিষয়ে মেহতার পাল্টা যুক্তি— সিস্টেম পুরো ব্যর্থ বলে আইনজীবীরাও যেন কোনও সরকার বিরোধী স্লোগান না–দেন৷ তিনি এও জানান, আইন–শৃঙ্খলা বজায় রাখার স্বার্থে প্রয়োজনে আবার বন্ধ রাখতে হতে পারে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা৷
সুপ্রিম–নির্দেশ
— সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার চূড়ান্ত প্রয়োজন ছাড়া মেট্রো পরিষেবা সম্পূর্ণ স্তব্ধ করা যাবে না। স্বাভাবিক ট্রেন চলাচল ও নাগরিকদের অবাধ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে
— ট্র্যাফিক পরিস্থিতি এবং আইন-শৃঙ্খলা বিবেচনা করে রাজধানীতে বসানো ব্যারিকেডগুলি অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের অবাধ যাতায়াত বজায় থাকে
— আইনসম্মত ক্ষেত্র ছাড়া ইন্টারনেট পরিষেবায় কোনও ভাবেই অপ্রয়োজনীয় রাশ টানা যাবে না
— কোনও ব্যক্তি শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র জমায়েতে সামিল হলে তাঁকে বেআইনি ভাবে আটক করা যাবে না, বিশেষ করে যেখানে বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা কার্যকর নয়, সেই এলাকায় তো একেবারেই নয়— সুপ্রিম কোর্ট চত্বর ও তার আশপাশে ১৬৩ ধারা জারির নোটিস অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। বিচার পাওয়ার অধিকারে কোনওভাবেই বাধা তৈরি করা যাবে না
— আন্দোলনকারী আইনজীবীদের বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হতে হবে এবং তাঁদের প্রতি আচরণেও সংযম বজায় রাখতে হবে
