আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডলারের তুলনায় টাকার দরপতন সামাল দিতে বড় পদক্ষেপ করেছে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই)। তার জেরে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ভারতীয় মুদ্রায়। চলতি সপ্তাহে ডলারের তুলনায় টাকার দর প্রায় ১.৯ শতাংশ বেড়েছে। যা গত চার বছরের মধ্যে এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। তবে টাকার দরে এই স্বস্তির ছবির উল্টোদিকে রয়েছে আর্থিক বাজারের নানা সমস্যা। বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে লেনদেনের গতি কমেছে, মুদ্রার ঝুঁকি সামলানোর খরচ বেড়েছে এবং সরকারি বন্ডের সুদও পৌঁছেছে তিন বছরেরও বেশি সময়ের সর্বোচ্চ স্তরে।
গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে টাকাকে রক্ষা করতে সবচেয়ে আগ্রাসী পদক্ষেপগুলির মধ্যে অন্যতম এই উদ্যোগ নিয়েছে আরবিআই। তবে টাকার দর সামলাতে গিয়ে নতুন বিধিনিষেধের প্রভাব পড়েছে ব্যাঙ্ক, আর্থিক সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের উপরেও। বাজারে ডলারের দামের ওঠানামা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে যে আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়, তার খরচ এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছে। ফলে টাকা কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও বাজারের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরতে সময় লাগতে পারে।
গত শনিবার আরবিআইয়ের ঘোষিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ২০ লক্ষ ডলারের বেশি মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত ডেরিভেটিভ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কগুলিকে সংশ্লিষ্ট টাকার অঙ্কের ২০ শতাংশ আলাদা করে রাখতে হবে। ডেরিভেটিভ হল এমন আর্থিক চুক্তি, যার মূল্য নির্ভর করে ডলারের মতো কোনও মুদ্রা বা অন্য সম্পদের দামের উপর। ভবিষ্যতে ডলারের দাম বেড়ে গেলে অতিরিক্ত খরচের ঝুঁকি এড়াতে আমদানি-রপ্তানিকারক সংস্থা এবং ব্যাঙ্কগুলি এই ধরনের চুক্তি ব্যবহার করে। নতুন বিধিনিষেধের ফলে সেই সুরক্ষার ব্যবস্থাই এখন অনেক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
তার প্রভাব স্পষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে। ভবিষ্যতে ডলার কেনার খরচ বোঝাতে ব্যবহৃত তিন মাসের ডলার-রুপি ফরোয়ার্ডের ইল্ড বৃহস্পতিবার বেড়ে ৬.৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১৬ সালের মে মাসের পর এই হার সর্বোচ্চ। বাজারে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত পরামর্শদাতা সংস্থা আইএফএ গ্লোবালের প্রধান অভিষেক গোয়েঙ্কার মতে, বাজারে লেনদেনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। আপাতত সংস্থাগুলিকে কেবল তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের জন্যই ঝুঁকি সামলানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
শুধু মুদ্রার বাজার নয়, চাপ বেড়েছে বন্ডের বাজারেও। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের চড়া দাম এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের টাকা তুলে নেওয়ার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। টাকার উপর চাপ কমাতে শুধু বাজারে হস্তক্ষেপ যথেষ্ট না হলে আরবিআইকে সুদের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে হতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সুদের হার বাড়লে ঋণের খরচ বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ব্যবসা এবং বিনিয়োগের উপর।
নতুন নিয়ম নিয়ে বিভ্রান্তি কাটাতে বৃহস্পতিবার ব্যাখ্যা দিয়েছে আরবিআই। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি সামলানোর উদ্দেশ্যে করা লেনদেনের ক্ষেত্রেই এই বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে। গ্রাহকদের হয়ে ডলার কেনাবেচা করা কিংবা বাজার সচল রাখার জন্য ব্যাঙ্কগুলির করা লেনদেন এর আওতায় পড়বে না। তবে এই ব্যাখ্যার পরেও বাজারের অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।
ব্যাঙ্কগুলির আশঙ্কা, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত গ্রাহক লেনদেন কমতে পারে। পাশাপাশি স্থির আয়ের আর্থিক সম্পদে বিনিয়োগ থেকেও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে তাদের ট্রেজারি বিভাগ। আরবিএলের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান অংশুল চান্দকের মতে, ঝুঁকি সামলানোর খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে তারল্য কমে যাওয়া এই পদক্ষেপের অনভিপ্রেত পরিণতি। দীর্ঘমেয়াদে লাভের আশায় আপাতত এই পরিস্থিতির মূল্য চোকাতে হতে পারে বলেও তাঁর মত।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বাজারে লিকুইডিটির ঘাটতি এবং মুদ্রার ঝুঁকি সামলানোর উচ্চ খরচ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতীয় সম্পদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরও বেশি মুনাফা চাইতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। কেউ কেউ নতুন করে বিনিয়োগ করতেও অনীহা দেখাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরবিআইয়ের হস্তক্ষেপ কমে গেলে রুপির উপর ফের চাপ বাড়ার আশঙ্কা থাকবে।
ইউবিএস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের শামাইলা খানের মতে, এই পরিস্থিতিতে নীতির স্বচ্ছতা এবং পূর্বানুমানযোগ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগকারীরা যাতে সহজে ঝুঁকি সামলাতে এবং বাজারে লেনদেন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য, নতুন নিয়মের কারণে ভারত সম্পর্কে সংস্থাটির দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন হয়নি। তবে ঝুঁকি সামলানোর খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভারতীয় সম্পদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মুনাফার হার বাড়তে পারে।
