বর্তমান যুগে আধুনিক জীবনযাত্রার চাকচিক্য ও মুখরোচক খাবারের সহজলভ্যতায় ভূরিভোজ মানুষের অন্যতম প্রধান বিনোদনে পরিণত হয়েছে। টেবিলে হরেক রকমের পদ, সামাজিক আপ্যায়ন আর উদরপূর্তি করে খাওয়াই যেন এখন সাধারণ নিয়মে রূপ নিয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিজ্ঞান আজ যখন অতিভোজনের নানাবিধ শারীরিক জটিলতা ও ব্যাধি নিয়ে সতর্ক করছে এবং ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ ও কম খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে, তখন ১৪শ বছরেরও আগে মানবজাতির জন্য নির্দেশিত নববী জীবনবিধান আমাদের ভিন্ন এক সুষম পথের দিশা দেয়।
ইসলামী স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ ইউটিউবে প্রকাশিত তার সাম্প্রতিক আলোচনায় অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনদর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত এক সুন্নাহ হলো ‘কম খাওয়া বা পরিমিত আহার করা’। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, সুন্নাহভিত্তিক জীবনধারায় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ নীতিগতভাবেই সুন্নাহর পরিপন্থি। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসাশাস্ত্র আজ সুস্থ থাকার জন্য পরিমিত আহারের যে তাগিদ দিচ্ছে, রাসুলেকারীম (সা.) তা শতাব্দীর পর শতাব্দী আগেই উন্মোচন করে গেছেন, যা নববী প্রজ্ঞা ও অলৌকিকতার এক উজ্জ্বল প্রমাণ।
১. পেটের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো পাত্র নেই
শায়খ আহমাদুল্লাহ হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে আলোচনা করেন, মুসনাদে আহমাদ ও মুস্তাদরাকে হাকেমে বর্ণিত একটি হাদিসে মহানবী (সা.) মানুষের পেটকে একটি রূপক পাত্রের সাথে তুলনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষ যত পাত্র পূর্ণ করে, তার মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও খারাপ পাত্র হলো মানুষের পেট।
অন্যান্য বস্তু (যেমন বোতল, বাটি) বা যেকোনো পাত্র পূর্ণ বা কানায় কানায় পূর্ণ করলে পাত্রের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু মানুষ যখন নিজের পেটকে খাবার ও পানীয় দিয়ে টইটম্বুর করে ফেলে, তখন তা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতি ও বিপত্তি ডেকে আনে। এই অর্থেই মহানবী (সা.) মানুষের পেটকে সবচাইতে নিকৃষ্ট পাত্র হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
২. পরিমিত আহারের নববী অনুপাত
ইসলামে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার ব্যতিক্রম নয় আমাদের খাদ্যাভ্যাসও। হাদিসের আলোকে শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, একজন মানুষের শরীরের স্বাভাবিক কাঠামো ও মেরুদণ্ড সোজা রেখে দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পাদন করার জন্য সামান্য কয়েক গ্রাস খাবারই যথেষ্ট।
সর্বোচ্চ সীমা (১/৩ নিয়ম)
কেউ যদি বেশি খেতেই চায়, তবে তার পেটের জন্য সর্বোচ্চ অনুপাত হবে—
- এক-তৃতীয়াংশ (১/৩): কঠিন খাদ্য বা সলিড খাবার (যেমন ভাত, রুটি ইত্যাদি)।
- এক-তৃতীয়াংশ (১/৩): তরল বা পানীয় (পানি, শাকসবজি, সালাদ ইত্যাদি)।
- এক-তৃতীয়াংশ (১/৩): খালি রাখা, যাতে হজমক্রিয়া (ডাইজেস্ট) সহজ হয় এবং স্বাচ্ছন্দ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলা যায়।
অথচ বর্তমান সমাজে আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে ‘নাক পর্যন্ত’ পেট পুরে খাওয়া। এরপর খাবার সামলাতে বা হজম করাতে আমরা নানা ওষুধ বড়ি খাই, এমনকি সেই ওষুধের জায়গাটাও পেটে খালি রাখি না।
৩. হারিয়ে যাওয়া সুন্নাহ বনাম প্রচলিত মনগড়া ধারণা
সামাজিক বাস্তবতায় দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আসল সুন্নাহ চর্চা না করে আমরা প্রায়ই নিজেদের মনগড়া প্রথা অনুসরণ করি। উদাহরণস্বরূপ, সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে—‘খাবারের পর মিষ্টি খাওয়া সুন্নাত’।
শায়খ আহমাদুল্লাহ স্পষ্ট করেন যে, মূল হাদিসে রাসুলে কারিম (সা.) মিষ্টিজাতীয় খাবার পছন্দ করতেন বলে উল্লেখ আছে; কিন্তু ‘খাবারের পরপরই মিষ্টি খেতেই হবে’—এমন সুনির্দিষ্ট কোনো সুন্নাত হাদিসে নেই। মিষ্টি খাওয়ার এই মনগড়া অজুহাত তৈরি করে মানুষ মূলত আরেকটু বেশি খাওয়ার পথ খুঁজে নেয়। পক্ষান্তরে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রকৃত সুন্নাহ ছিল খাবারের পরিমাণ কম রাখা বা অল্প খাওয়া, যা আজ সমাজ থেকে হারিয়ে গেছে বললেই চলে।
৪. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও হাদিসের সার্বজনীন মোজেজা
এই হাদিসটির সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াতের এক অলৌকিক দিক ফুটে ওঠে। মদিনার জীবনে নববী সামাজিক প্রেক্ষাপটে চরম অভাব-অনটন ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘরে মাসের পর মাস চুলায় আগুন জ্বলত না; শুধু খেজুর আর পানি (আসওয়াদাইন) খেয়ে দিন অতিবাহিত হতো। সাহাবিদের ঘরেও এমন পর্যাপ্ত খাবার প্রিজার্ভ বা জমা রাখার সুযোগ ছিল না, মেহমান আসলে নিজেদের বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে নিজেরা না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনাও সাধারণ ছিল।
শায়খ আহমাদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, যে সমাজে খাবারই ছিল না, সেই সমাজে দাঁড়িয়ে কেন বিশ্বনবী (সা.) বললেন, ‘কম খাও, মেরুদণ্ড সোজা রাখার মতো কয়েক লোকমাই যথেষ্ট’? এর উত্তর হলো, এই হাদিস কেবল তৎকালীন মদিনাবাসীর জন্য ছিল না; বরং এটি কিয়ামত পর্যন্ত আগত পুরো মানবজাতির জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এক অমর মোজেজা ও সার্বজনীন নির্দেশনা। আজ সাড়ে ১৪শ বছর পর খাদ্যের প্রাচুর্যের যুগে যখন মানুষ ভূরিভোজের ব্যাধিতে আক্রান্ত, তখন মনে হয় এই হাদিস যেন আজকের এই যুগের সংকট সমাধানের জন্যই বর্ণিত হয়েছিল ।
৫. সবল মুমিন গঠনে শারীরিক সুস্থতার গুরুত্ব
ইসলাম একজন মুসলিমকে সবদিক থেকে শক্তিশালী ও কর্মক্ষম দেখতে চায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুর্বল মুমিনের চেয়ে সবল ও শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ।’
যদি অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাসের কারণে শরীরে চর্বি জমে অলসতা ও স্থূলতা তৈরি হয়, তবে একজন মানুষ শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে সে আর হাদিসে বর্ণিত সেই ‘সবল মুমিন’ হওয়ার কাঙ্ক্ষিত স্তরে পৌঁছাতে পারে না। তাই শরীরকে ফিট রাখা, অলসতা দূর করা এবং ইবাদতে একাগ্রতা আনার জন্যও পরিমিত আহারের সুন্নাহ পুনর্জীবিত করা অত্যন্ত জরুরি।
