মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র ও সমাজ: সমন্বয়হীনতার অন্ধকারে বাংলাদেশ
সাইফুল ইসলামপ্রকাশ:
একটি সমাজের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হওয়ার জন্য সব সময় যুদ্ধ কিংবা দুর্ভিক্ষের প্রয়োজন হয় না। কখনো কখনো তারুণ্যের স্বপ্ন, কর্মক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসকে নিঃশব্দে গ্রাস করাই যথেষ্ট। মাদক সেই নীরব বিপর্যয়ের নাম। এটি কেবল ব্যক্তির শরীর ও মনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না; পরিবারকে বিপর্যস্ত করে, সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে এবং একটি দেশের মানবসম্পদের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে।
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারি অভিযান, আইন প্রয়োগ এবং সামাজিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চলমান। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এত উদ্যোগের পরও মাদক প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং সমাজের সম্মিলিত শক্তি যদি একই লক্ষ্যে পরিচালিত না হয়, তাহলে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের ভিড়ে সমস্যার মূল শিকড় অক্ষত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের সংকট তাই শুধু মাদক নির্মূলের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়েরও পরীক্ষা।
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী ও প্রশাসনিক সংস্থা। মাদক পাচার প্রতিরোধ, অপরাধী শনাক্তকরণ, অবৈধ সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া এবং জনসচেতনতা তৈরিতে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাদক সমস্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় হিসেবে দেখলে এর বহুমাত্রিক চরিত্র উপেক্ষিত হয়। মাদক উদ্ধার, মামলা ও গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রশাসনিক তৎপরতার পরিচায়ক হতে পারে; কিন্তু এগুলো দিয়ে সমস্যার প্রকৃত অবস্থা পুরোপুরি বোঝা যায় না। নতুন করে মাদক গ্রহণের প্রবণতা কমছে কি না, চিকিৎসার সুযোগ বাড়ছে কি না, চিকিৎসা শেষে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
একটি অভিযান সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে পারে, কিন্তু একটি পরিবারকে মাদকের বিপর্যয় থেকে ফিরিয়ে আনার সাফল্য হয়তো প্রচারের আলো পায় না। অথচ রাষ্ট্রের সাফল্য মূল্যায়নে এই দ্বিতীয় কাজটির গুরুত্বও অপরিসীম। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালানোর পাশাপাশি সরবরাহব্যবস্থার ওপরের স্তর, অর্থায়ন, পরিবহন ও অপরাধলব্ধ অর্থের প্রবাহ অনুসন্ধান জরুরি। এ ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ তোলা যাবে না; তবে অপরাধী নেটওয়ার্কের সব স্তরের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনের শাসনের পরীক্ষা এখানেই আইন প্রয়োগে যেন সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাবের কারণে বৈষম্য তৈরি না হয়।
মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিস্তৃত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ অপরাধ দমন ও আইন প্রয়োগে কাজ করে; সীমান্তরক্ষী বাহিনী সীমান্তে পাচার প্রতিরোধ করে; স্বাস্থ্য বিভাগ চিকিৎসাসেবা দেয়; সমাজসেবা অধিদপ্তর পুনর্বাসনে ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলো প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কিন্তু দায়িত্বের এই বিস্তৃতি সব সময় কার্যকর সমন্বয়ে রূপ নেয় না। কোথাও তথ্য বিনিময় দুর্বল, কোথাও উদ্যোগ ব্যক্তিনির্ভর, আবার কোথাও প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন।
ধরা যাক, কোনো এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সংগঠনগুলো উদ্বিগ্ন। তাদের অভিজ্ঞতা ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রশাসন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নিয়মিত যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে কি? ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের জন্য কাউন্সেলিং, পারিবারিক সহায়তা ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করা হচ্ছে কি? মাদকাসক্ত কেউ চিকিৎসা নিতে চাইলে তাকে নির্ভরযোগ্য সেবাকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে কি? এসব প্রশ্নের উত্তরই সমন্বয়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরবে।
প্রতিষ্ঠান থাকা আর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিতভাবে কাজ করা এক কথা নয়। সমন্বয়হীনতার ফলে সরকারি সম্পদ, সামাজিক উদ্যোগ ও স্থানীয় অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহৃত হয়; অথচ সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে এগুলোর কার্যকারিতা অনেক বাড়তে পারে।
দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, যুবসংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় ক্লাব বিভিন্নভাবে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করে। এসব উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কিন্তু সচেতনতামূলক সভা, শপথ গ্রহণ কিংবা প্রচারপত্র বিতরণই যথেষ্ট নয়। একজন শিক্ষার্থী মাদকের ঝুঁকিতে পড়লে সে কোথায় সাহায্য পাবে? তার পরিবার কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে? প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা বা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার ব্যবস্থা আছে কি? সামাজিক সংগঠনগুলো কি সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে কাজ করছে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সচেতনতা অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে।
অনেক সামাজিক উদ্যোগ নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠকের আগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। উদ্যোক্তা সরে গেলে কার্যক্রমও থেমে যায়। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও যৌথ পরিকল্পনা না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ের মূল্যবান অভিজ্ঞতা বৃহত্তর প্রতিরোধব্যবস্থায় যথাযথভাবে কাজে লাগে না। এখানে রাষ্ট্র ও সমাজের পরস্পরকে দোষারোপ করার সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের রয়েছে আইনগত ক্ষমতা, অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো; সমাজের রয়েছে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং তাদের বাস্তব সমস্যার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। এই দুই শক্তিকে বিচ্ছিন্ন রেখে মাদক নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
মাদক ব্যবসা এবং মাদকাসক্তি এক বিষয় নয়। মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অপরাধের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ অপরিহার্য; অন্যদিকে মাদকাসক্ত ব্যক্তির জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক পুনর্বাসন। সব মাদকাসক্তকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করলে চিকিৎসা গ্রহণের পথে সামাজিক ভয় ও কলঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের জুনে মান্যবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি সরকারি গবেষণার উল্লেখ করে জানান, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানের পদ্ধতি ও সংজ্ঞা যাচাই করা প্রয়োজন; তবে সরকারি পর্যায়ে সমস্যাটির ব্যাপকতা স্বীকার করার তাৎপর্য রয়েছে। একই বক্তব্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগের সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে আসে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সরকারি ও বেসরকারি কেন্দ্রে মোট ৩৯ হাজার ৭৬ জন এবং ২০২৫ সালে ৩৯ হাজার ৬৪১ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০২৫ সালে সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন ৭ হাজার ১৫৯ জন, আর বেসরকারি কেন্দ্রে ৩২ হাজার ৪৮২ জন। এই পরিসংখ্যান থেকে চিকিৎসার সামগ্রিক চাহিদা কিংবা সেবার মান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না। তবে সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা, ব্যয়, ভৌগোলিক প্রাপ্যতা এবং সেবার মান নিয়ে বিস্তারিত মূল্যায়নের প্রয়োজন স্পষ্ট।
২০২৬ সালে সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসনকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে। তবে অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, মানসম্মত সেবা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী অনুসরণের ব্যবস্থা। চিকিৎসা শেষে একজন তরুণ যদি বেকারত্ব, পারিবারিক প্রত্যাখ্যান কিংবা পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে ফিরে যেতে বাধ্য হন, তাহলে সুস্থ জীবন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। তাই নিরাময়কেন্দ্রের দায়িত্ব হাসপাতালের দরজায় শেষ হওয়া উচিত নয়। পরিবার, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও কর্মসংস্থানব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পুনর্বাসনের পথ তৈরি করতে হবে।
মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কারণ কাজ করতে পারে। বেকারত্ব কিংবা হতাশাকে এর একমাত্র কারণ বলা ভুল; তবে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং সুস্থ বিনোদনের সীমিত সুযোগ তরুণদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। শহরে খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক এলাকায় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ সীমিত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তাও অপ্রতুল। এ পরিস্থিতিতে তরুণদের জন্য খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও পরামর্শসেবার সুযোগ বাড়ানো মাদক প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ কাজে সহায়তা করতে হবে। শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন দেখা দিলে তাদের অপমান বা শাস্তি দেওয়ার আগে সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা জরুরি। তবে সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে মাদকাসক্ত বলে চিহ্নিত করাও অনুচিত। প্রয়োজন পেশাদার মূল্যায়ন, গোপনীয়তা রক্ষা এবং যথাযথ সহায়তা। মাদক প্রতিরোধ মানে শুধু তরুণদের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা নয়; তাদের এমন পরিবেশ দেওয়া, যেখানে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন গড়তে পারে এবং সংকটে পড়লে সাহায্য চাইতে পারে।
বাংলাদেশে কার্যকর মাদক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিয়মিত তথ্য বিনিময়, যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় এলাকার বাস্তবতা অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা রক্ষা করতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রের মান নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসার ব্যয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র মানুষের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদকবিরোধী সামাজিক উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের পরামর্শসেবা, অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ, যুবকদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকে।
মাদক নিয়ন্ত্রণের সাফল্য পরিমাপের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু অভিযান, গ্রেপ্তার কিংবা সচেতনতামূলক সভার সংখ্যা দিয়ে অগ্রগতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। চিকিৎসায় প্রবেশাধিকার, পুনর্বাসনের ফলাফল, নতুন করে মাদক গ্রহণের প্রবণতা এবং প্রতিরোধমূলক কর্মসূচির কার্যকারিতাও মূল্যায়ন করতে হবে। সরকারি অর্থের ব্যবহার ও কর্মসূচির অগ্রগতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি। মাদক ব্যবসা ও পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তির চিকিৎসা, মর্যাদা ও পুনর্বাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। সামাজিক উদ্যোগের নামেও অননুমোদিত চিকিৎসা, নির্যাতন কিংবা অমানবিক আটককে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আবার সমাজের ওপরও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া যায় না। রাষ্ট্রকে অপরাধী নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে হবে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। সমাজকে তরুণদের পাশে দাঁড়াতে হবে, পরিবারকে সহায়তা দিতে হবে এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ করে দিতে হবে।
আমাদের সমস্যা উদ্যোগের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি নয়; বরং বিদ্যমান উদ্যোগগুলোকে একটি কার্যকর ব্যবস্থার অধীনে সংগঠিত করতে না পারার ঝুঁকি। রাষ্ট্র যদি শুধু অভিযান চালায়, সমাজ যদি শুধু সচেতনতার স্লোগান দেয়, আর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন যদি বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এই লড়াইয়ের কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
মাদকবিরোধী সংগ্রামের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত কতজন গ্রেপ্তার হলো, তার পাশাপাশি কতজন তরুণ মাদকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেল, কতজন চিকিৎসা পেল এবং কতজন সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে পারল তার ভিত্তিতে।
একটি প্রজন্মকে রক্ষা করতে শুধু কঠোর আইন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্র, সক্রিয় সমাজ, সহজলভ্য চিকিৎসা এবং কার্যকর পুনর্বাসন। মাদকের বিরুদ্ধে প্রকৃত প্রতিরোধ শুরু হবে সেদিনই, যেদিন সরকারি ক্ষমতা ও সামাজিক শক্তি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সীমা পেরিয়ে একটি অভিন্ন জাতীয় দায়িত্বে পরিণত হবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই–এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
