নদী। শব্দটি শুনলে চোখে ভেসে ওঠে বিস্তীর্ণ জলরাশি, মেঘের স্তর সাজানো আকাশ। মনে আসে পদ্মা, মেঘনা, যমুনার নাম। বাংলার তিন বড় নদী। এর বাইরে শত শত নদ-নদী বাংলার বুক চিরে বয়ে চলেছে। চলার পথে ছুঁয়েছে মানবজীবন। মানুষের সঙ্গে নদীর সম্পর্ক বহুমাত্রিক। জীবন-জীবিকার বাইরে একসময় নদীই ছিল যাতায়াতের পথ। ঘাটে বাঁধা থাকত সারি সারি নৌকা। নৌকার মাঝি যাত্রীদের নিয়ে যেত সুদূরে। এরপর ক্রমেই যুগ বদলেছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় পিচঢালা পথ হয়েছে। রিকশা, বাস, ট্রেন কতশত বাহন হয়েছে মানুষের যাতায়াতের; নদীপথে যাতায়াত কমেছে। তবু আজও দেশের কিছু অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের পথ নদী। নদীর পাড়ে ঘাট বানিয়েছে মানুষ; ফেরিঘাট। কেবল যাত্রী নয়, বাস, ট্রাক, কারসহ বিভিন্ন পরিবহনও পারাপার হচ্ছে ফেরিতে। তেমনই এক ফেরিঘাটের নাম পাটুরিয়া। এই এক ঘাটের অনেক গল্প আলোকচিত্রে ধারণ করেছেন আলোর ইশকুলের ফটোগ্রাফি কোর্সের ১১তম ব্যাচ। তাদের ৫৯টি আলোকচিত্র সাজানো হয়েছে ‘ফেরিঘাটের জীবন’ নামের প্রদর্শনী।
বহতা নদীর মতো ফেরিঘাটেরও নিজস্ব গতি আছে। এই গতি কেবল নিত্যনতুন যাত্রীদের আনাগোনার নয়। যেমনটা ওই ফটোগ্রাফি কোর্সের কোর্স কো-অর্ডিনেটর মেসবাহ উদ্দিন সুমন বলেন, ‘ফেরিঘাট শুধু মানুষ পারাপারের স্থান নয়; এটি মানুষের অপেক্ষা, ব্যস্ততা, শ্রম, যাত্রা, সম্পর্ক এবং প্রতিদিনের জীবনের নানা গল্পের এক মিলনস্থল।’ গভীরভাবে দেখলে এগুলো মিলেই যেন ‘ফেরিঘাটের জীবন’।
নৌকার যেমন মাঝি থাকে, ফেরি পারাপারের কাজেও কিছু মানুষের শ্রম আছে; ফেরিচালক তারা। নিত্যদিন ফেরিতে করে মানুষের পাশাপাশি পণ্য এবং বাস, ট্রাক, কারসহ বিভিন্ন পরিবহন পারাপার করেন। একটি বাহন অন্যান্য বাহন নিয়ে চলে অন্যত্র। এটাও যেন একধরনের ‘ফ্রেম উইদইন ফ্রেম’-এ ছবি তোলার মতোই বিষয়। ফ্রেমওয়ালা এক জানালার কাচের ভেতর দিয়ে দেখা যায় সারি সারি যানবাহন; স্থির তবু স্থির নয় যেন।
ফেরি পারাপারের সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকার বড় সম্পর্ক রয়েছে। ছবিতে তাই দেখা যায় ফেরির ফেরিওয়ালাদের। আর যেখানে নদী আছে, যার ঘাট আছে সেখানকার জীবন আরো অগাধ। এসব ঘিরে একটা জনপদ গড়ে ওঠে। তাদের জীবন-জীবিকার বাইরে জীবনকে ভাগ করে নেয়ার, উপভোগের কেন্দ্রও এটি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় শেষের দেয়ালে টাঙানো শিশুদের নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ার ছবি দেখে সেটি অনুভব করা যায়।
১১তম ব্যাচের নবীন আলোকচিত্রী রেউন তানজিন অশ্রু বলেন, ‘পাটুরিয়া ফেরিঘাটে ছবি তুলতে গিয়ে কত সাধারণ দৃশ্য যে নতুন করে চোখে পড়েছে! কখনো একটা মুহূর্ত ধরে রাখতে পেরে ভালো লেগেছে, কখনো মনে হয়েছে আরেকটু ভালোভাবে ছবিটা তুলতে পারতাম। এই শেখা, ভুল করা, আবার চেষ্টা করার মধ্য দিয়েই আমার আলোকচিত্রের যাত্রাটা এগিয়ে যাচ্ছে।’
এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে নবীন আলোকচিত্রীদের যাত্রা যত এগোচ্ছে, সঙ্গে দর্শকদেরও দেখার পরিধিও বাড়ছে। চিত্রশিল্পের বাইরে গিয়ে প্রদর্শনীও সেজে উঠছে নতুন আঙ্গিকে। আগ্রহীরা দেখে আসতে পারেন। ৮ অক্টোবর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের চিত্রশালায় শুরু হওয়া প্রদর্শনীটি চলবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত।
