ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে ফলের ক্যারেটের সারি, চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নানা সরঞ্জাম আর মাথার ওপর স্থায়ীভাবে বাঁশের চরাট ও ত্রিপল টানিয়ে তৈরি করা অবৈধ শেডÑ এভাবেই দিনের পর দিন প্রকাশ্যে দখল করে নেওয়া হয়েছে পথচারীদের চলাচলের পথ। বগুড়া শহরের গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম স্টেশন রোড এলাকায় ফুটপাত দখলের এই চিত্র এখন নিত্যদিনের পরিচিত দৃশ্য। এতে করে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে ঝুঁকি নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন ব্যস্ততম এই সড়কে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যানজট, অন্যদিকে মূল সড়কে হাঁটায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ছে হাজার হাজার মানুষ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। শহিদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, করতোয়া মাল্টিমিডিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং শহিদ চান্দু স্টেডিয়ামে যাতায়াতের অন্যতম পথ এটি। আন্তর্জাতিক মানের স্টেডিয়াম থাকায় এই সড়ক দিয়ে নিয়মিত দেশি-বিদেশি খেলোয়াড় ও অতিথিরা যাতায়াত করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই পথ সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দখলমুক্ত রাখার নির্দেশ থাকলেও বাস্তবে নিয়ম আর বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থেকে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের অভিযোগ, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত স্টেশন রোডে ফলের খাঁচা ও ক্যারেট ওঠানামা, পাইকারি ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। ফুটপাতের বড় অংশজুড়ে ক্যারেট রাখার পাশাপাশি দোকানদার ও ক্রেতাদের ব্যবহৃত যানবাহন মূল সড়কের ওপর পার্ক করে রাখায় চলাচলের পথ অতিমাত্রায় সংকুচিত হয়ে পড়ে; বিশেষ করে দক্ষিণ পাশের ফুটপাতে দুই সারি করে ফলের ক্যারেট রাখায় সাধারণ মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছে না। বাধ্য হয়ে মূল রাস্তায় নামলে একজন অন্যজনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চলতে হয়। এতে শিশু, নারী ও প্রবীণ নাগরিকদের যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সরকারি আজিজুল হক কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, ‘স্টেশন রোড দিয়ে প্রতিদিন আমাদের কলেজে যাতায়াত করতে হয়। ফলের দোকানের কারণে ফুটপাতে ভিড় লেগেই থাকে, তার ওপর কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতাদের বাইক ও রিকশা রাস্তার ওপরে রাখা হয়। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ঝুড়ির সঙ্গে বা অন্য পথচারীর সঙ্গে ধাক্কা খাওয়া নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেয়েদের জন্য এমন পরিস্থিতিতে যাতায়াত করা আরও বেশি অস্বস্তিকর। বহুবার এই ফুটপাত সরানোর খবরের কথা শুনেছি, কিন্তু বাস্তবে কোনো পরিবর্তন দেখি না।’
এদিকে ফুটপাত ও হকার্স উচ্ছেদে প্রশাসন কেবল শহরের সাতমাথাকেন্দ্রিক সাময়িক অভিযান পরিচালনা করলেও স্টেশন রোডে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। যদিও বগুড়া সিটি করপোরেশন এবং জেলা প্রশাসন থেকে একাধিকবার বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশ জারি করা হয়েছে যে সব দেশি ফল ব্যবসায়ীকে শহরের ‘তিনমাথা’ বা ‘মাটিডালি’ নির্ধারণ করা ফলের আড়তে স্থানান্তর হতে হবে।
এর আগেও ফলের দোকানগুলো সরাতে বেশ কয়েকবার পদক্ষেপ নেওয়া হলেও কিন্তু তা আজও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ গত ২৭ জুলাই বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ সাঈদ আলী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সাতমাথা থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত দেশি ফল ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং আদেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে বাধ্য হয়েই তারা ফুটপাতে খাঁচা রাখছেন। তবে সরকার নির্ধারিত তিনমাথা বা মাটিডালি ফলের আড়তে সব ব্যবসায়ী একযোগে স্থানান্তরিত হলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
বগুড়া জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার অভাবে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে উচ্ছেদ করা হলেও তারা পুনরায় বসে যায়। তবে তিনমাথা ও মাটিডালিতে দোকান সরানোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মনিটরিং করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, ফুটপাত দখলকারীদের নোটিশ জারি ও মাইকিং করে সতর্ক করা হয়েছে। বর্তমানে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
