প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে দেশের পার্বত্য এলাকা ভ্রমণপিপাসুদের একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। এর মধ্যে সাজেক দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। পাহাড়, মেঘ, সবুজ উপত্যকা ও আঁকাবাঁকা সড়কের সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে ছুটে যান। পর্যটননির্ভর স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির জন্যও সাজেক গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে বারবার অবরোধ, উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ২২ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজার এলাকায় সড়ক অবরোধকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন কয়েকজন। তবে সেখানে আটকে পড়া প্রায় তিন হাজার পর্যটককে বিশেষ নিরাপত্তায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে।
পর্যটনকেন্দ্রে বেড়াতে গিয়ে কোনো মানুষ গোলাগুলির মধ্যে পড়বেন—এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পর্যটকেরা সেখানে যান নিরাপদে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে। তাদের সামনে রাজনৈতিক বা আঞ্চলিক বিরোধ, অবরোধ কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম সড়কে কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য উত্তেজনাও বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
সর্বশেষ ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় বিপুলসংখ্যক পর্যটক নিরাপদে ফিরে আসতে পেরেছেন—এটি স্বস্তির বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের এমন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হলো কেন? পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি আগেই কেন সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা হলো না? পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার আগেই প্রশাসনের সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন ছিল। সাজেকের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যেও পার্থক্য রয়েছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। সাজেকে বারবার অস্থিরতার প্রভাব শুধু পর্যটকদের ওপরই পড়ছে না; স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রিসোর্ট, কটেজ, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বহু মানুষ পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। অস্থিরতার কারণে পর্যটক কমে গেলে বুকিং বাতিল হয়, ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন এবং স্থানীয় মানুষের আয় কমে যায়। ইতোমধ্যে অবরোধ ও সহিংসতার কারণে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার খবরও এসেছে।
আমরা মনে করি এ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব কেবল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাময়িক নিরাপত্তা দেওয়া নয়; দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথও খুঁজে বের করা। সাজেকসহ পুরো পার্বত্য অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র তৎপরতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং দুর্গম এলাকায় নিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করা দরকার। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
পর্যটন মৌসুমে সাজেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য সরবরাহও জরুরি। কোনো এলাকায় ঝুঁকি থাকলে পর্যটকদের আগেই সতর্ক করতে হবে। পর্যটনকেন্দ্র খোলা বা বন্ধের সিদ্ধান্তে যেন রাজনৈতিক চাপ কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য না পায়। মানুষের জীবনই হতে হবে সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচনা।
আমরা মনে করি, সাজেকসহ পর্যটন স্পটগুলোর সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সেখানে স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। পাহাড়ের মানুষ যেমন নিরাপদে বসবাসের অধিকার রাখেন, তেমনি দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরও নিরাপদে চলাচল ও ভ্রমণের অধিকার রয়েছে। কোনো গোষ্ঠীর সংঘাত, অবরোধ বা অস্ত্রের মহড়া সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারে না।
সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন গোলাগুলির ঘটনা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা, পর্যটন এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। পর্যটকদের জীবন নিয়ে কোনো ধরনের ঝুঁকি নেয়া যাবে না। সাজেককে নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে দ্রুত, কার্যকর ও স্থায়ী পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।
