ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল শুক্রবার ভারতের ১৮টি রাজ্যের ৮৮টি শহরে ১৪৫টি সংগঠন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নতুন কর্মসূচি নিয়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। নয়াদিল্লিতে মিছিল নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের দিকে এগোতে থাকলে পুলিশ শতাধিক বিক্ষোভকারীকে আটক করে।
‘পিপল এগেইনস্ট এসআইআর’ নামের একটি সংগঠনের দিল্লি সমন্বয় কমিটির ডাকে মিছিলটি শুরু হয় গোল ডাকখানার কাছে, কালীবাড়ি মার্গ ও ভাই বীরসিং মার্গের সংযোগস্থলে। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা ও ব্যানার। শিক্ষার্থী, তরুণ ও কৃষকদের পাশাপাশি
মিছিলে ছিলেন সিপিআই নেত্রী বৃন্দা কারাত এবং এআইডিডব্লিউএ ও এআইডিএসওর সদস্যরা। আয়োজকদের তালিকায় ছিলেন অভিনেতা প্রকাশ রাজ, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, অর্থনীতিবিদ পরকাল প্রভাকর, কৃষক নেতা রাকেশ টিকায়েত, তথ্য অধিকারকর্মী অঞ্জলি ভরদ্বাজ, সাহিত্য সমালোচক গণেশ দেবী, কর্মী তুষার গান্ধী, এআইএসএর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা এবং এসএফআই নেত্রী আইশি ঘোষ। সিপিআইর পি সন্তোষও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
পুলিশ ফৌজদারি কার্যবিধির নতুন রূপ বিএনএসএসের ১৬৩ ধারা জারি করে জমায়েত নিষিদ্ধ করেছিল। মিছিল আটকে দেওয়া হলে বিক্ষোভকারীরা রাস্তাতেই বসে পড়েন এবং আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী জনগণের সংসদ বসান। এক বিক্ষোভকারী বলেন, এটি যন্তর মন্তর ফিরে পাওয়ার লড়াই নয়, গণতন্ত্র ও দেশ বাঁচানোর লড়াই। আরেকজন বলেন, যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে বাতিল করা হলেও দেশের প্রতিটি রাস্তাই এখন যন্তর মন্তর হয়ে উঠবে।
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৮টি রাজ্যের ৮৮টি শহরে ১৪৫টি সংগঠনকে নিয়ে কর্মসূচি পরিকল্পনা করা হয়েছে। সংগঠনটি একটি ওয়েবসাইটও চালু করেছে, যেখানে বিভিন্ন শহরের কর্মসূচির তথ্য রয়েছে। আন্দোলনের কর্মসূচি ১ নভেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত।
প্রতিবাদ আটকাতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই কোনো চেষ্টা বাদ রাখেনি দিল্লি পুলিশ, এমনটাই অভিযোগ। অনুমতি প্রত্যাখ্যান, যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থল হিসেবে বাতিল ঘোষণা, মেট্রোস্টেশন বন্ধ, মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, যুব ও ছাত্রনেতাদের আটক এবং গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে রেল পরিষেবা থামিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আন্দোলন শুরু হয় ২ অক্টোবর যন্তর মন্তরে, সেদিন প্রায় ৪ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক কর্মী মোতায়েন ছিল।
এর মধ্যে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রাণালয় দিল্লিতে ২৭৩ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) মোতায়েন ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়েছে। দিল্লি পুলিশের অনুরোধে, ফ্ল্যাশ প্রতিবাদের আশঙ্কায় এটি দ্বিতীয়বার বাড়ানো হলো। পিটিআই জানায়, এই বাহিনীর মধ্যে ১২৫ কোম্পানি সিআরপিএফ (২০টি নারী ইউনিটসহ), ২০ কোম্পানি আরএএফ, ৪৬ কোম্পানি বিএসএফ, ৩৯ কোম্পানি আইটিবিপি, ৩১ কোম্পানি এসএসবি এবং ১২ কোম্পানি সিআইএসএফ।
উল্লেখ্য, ৯ অক্টোবর সিজেপির নেতৃত্বে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ এবং ১৬ অক্টোবর তাদের লেহরা দো তিরঙ্গা কর্মসূচির পর রাজধানীতে রাজনৈতিক তৎপরতা বেড়েছে।
একই দিনে দিল্লি হাইকোর্ট এআইএসএর সভাপতি নেহা বোরার আবেদন খারিজ করেছে। ১৬ অক্টোবরের লেহরা দো তিরঙ্গা মিছিলে অংশ নেওয়ার পর শান্তিরক্ষার জন্য ১০ হাজার টাকার ব্যক্তিগত মুচলেকা ও একজন জামিনদার দেওয়ার যে নোটিশ পুলিশ দিয়েছিল, তারই বিরুদ্ধে তিনি আদালতে গিয়েছিলেন। বিচারপতি সুব্রহ্মণ্যম প্রসাদ আবেদন খারিজ করলেও নির্দেশ দেন, তাকে সব প্রাসঙ্গিক নথি সরবরাহ করতে হবে।
অন্যদিকে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস নিজেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া পৃথক মামলায় মন্দির মার্গ থানায় বিশেষ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির হন। পরে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। রাঙ্কা বলেন, জেলে থাকলেও আন্দোলন চলবে, আর পরবর্তী পদক্ষেপ চূড়ান্ত হলে জানানো হবে। দাস দাবি করেন, জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করতেই হবে।
চেন্নাইয়ে এসএফআই, সিজেপিসহ বিভিন্ন ছাত্র ও যুব সংগঠন অবস্থান বিক্ষোভ করে জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করে। মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্তাক্রুজ ক্যাম্পাসের মূল ফটকের সামনেও কলেজশিক্ষার্থীরা একই দাবিতে বিক্ষোভ দেখান।
কেরালায় নতুন রাজ্যপাল ওম প্রকাশ মাথুর দায়িত্ব নেওয়ার দিনেই এলডিএফ-সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠনগুলো লোকভবনের দিকে মিছিল করে। বিরোধী দলনেতা পিনারাই বিজয়ন মিছিলের উদ্বোধন করেন। বিকাল ৩টায় শুরু হওয়া এ মিছিলে এসএফআই, এআইএসএফ, কেএসসি (এম), এসএসএআই ও এআইডিএসওর কর্মীরা অংশ নেন।
তামিলনাড়ুতে ক্ষমতাসীন তামিলগা ভেট্টি কঝগম (টিভিকে) ও তার শরিকরা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অর্চনা পট্টনায়কের নেতৃত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করে। জ্বালানি ও আইনমন্ত্রী সিটিআর নির্মল কুমার বলেন, শুরু থেকেই টিভিকে এসআইআরের বিরোধী। তার দাবি, এসআইআর না হলে ২৩ এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনে দল ১৬০টির বেশি আসন পেত। তিনি আরও বলেন, এসআইআরের সময় বড় ধরনের ত্রুটি হয়েছে এবং নারী ও তরুণদের বাদ দেওয়া হয়েছে। তাই জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হচ্ছে।
বিরোধী ইন্ডিয়া জোট ১ নভেম্বর রামলীলা ময়দানে সমাবেশের পর নভেম্বরের শুরুতেই জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে নতুন দফার প্রতিবাদের পরিকল্পনা করছে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে মধ্য দিল্লিতে একাধিক মিছিলের পর নেতারা নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন।
