শামিম শিকদার।।
খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (খুকৃবি) অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের নিষ্পত্তি না হতেই শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশনের উদ্যোগ বির্তক শুরু হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪২৬ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধান এবং সাবেক উপাচার্যসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। এ অবস্থায় পদোন্নতি বোর্ড গঠন ও প্রক্রিয়া শুরু করা উদ্বেগজনক। এতে সমাজে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হবে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, পদোন্নতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে তারঁ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৭-২৯ অক্টোবর শিক্ষকদের পদোন্নতি বোর্ডের কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, যেসব নিয়োগের স্বচ্ছতা, যোগ্যতা যাচাই ও বিধিবিধান অনুসরণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে, সেসব নিয়োগের আওতায় থাকা ব্যক্তিদের পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে কী ধরণের যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে? নিয়োগের বৈধতা, সংশ্লিষ্টদের যোগ্যতা এবং পদোন্নতির নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা না করে এ প্রক্রিয়া যথাযথ হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও পদোন্নতি শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষার মান, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, মেধার মূল্যায়ন এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ ও আইনি কার্যক্রম চলমান থাকার প্রেক্ষাপটে আসন্ন পদোন্নতি বোর্ডের সিদ্ধান্ত কতটা স্বচ্ছ, নিয়মসম্মত ও যুক্তিসংগত হবে, তা নিয়ে বির্তক তৈরি হয়েছে।
নাম প্রকাশ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকার শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না।
অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রার্থীর যোগ্যতা ও নির্ধারিত শর্ত যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা পূর্ণাঙ্গভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, কোনো নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্তের সঙ্গে প্রার্থীদের যোগ্যতার তুলনা এবং নিয়োগ বোর্ডের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র বের করা জরুরি।
দুদকের একটি নথিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ৪২৬ জনের নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগের তদন্তে প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র সংগ্রহের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে নথি চাওয়ার তথ্যও রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখের একটি চিঠিতে নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগের অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য একটি নথিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণের জন্য দুদক কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার নির্দেশনার কথাও রয়েছে।
সাবেক উপাচার্যসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা: খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শহীদুর রহমান খানসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই দুদকের খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে সংস্থাটির উপপরিচালক সুমিত্রা সেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতার অপব্যবহার করে অযোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া, যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা এবং নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রে অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অপর আসামিদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার খন্দকার মাজহারুল আনোয়ার ও বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম রয়েছে।
২৭-২৯ অক্টোবর প্রমোশন বোর্ড, সামনে একাধিক প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রমোশন বোর্ডের কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে নিয়োগের বৈধতা ও পদোন্নতির যোগ্যতা যাচাই নিয়ে। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নিয়োগের সময় কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা কিংবা নিয়োগবিধি অনুসরণ নিয়ে প্রশ্ন থেকে থাকলে পদোন্নতির আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।
তাঁদের মতে, নিয়োগপ্রক্রিয়ার অনিয়মের অভিযোগের যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়া পদোন্নতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক ও আইনগত জটিলতা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি পাওয়ার প্রত্যাশী অন্য শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আসাদুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে নিয়োগ, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষপাত করছেন। তাঁরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু পদে নিয়োগ, পদায়ন এবং প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতা কিংবা নির্দিষ্ট ব্যক্তিবলয়ের প্রভাব কাজ করেছে। পাশাপাশি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ চলতে থাকলে তার প্রভাব শুধু প্রশাসনিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ, শিক্ষার্থীদের আস্থা, গবেষণার পরিবেশ এবং প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক ভাবমূর্তিও জড়িত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
অবশ্য এসব অভিযোগ সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টার মো: রেজাউল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল নিয়ম মেনেই পদোন্নতি বোর্ড বসছে। কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি এই মূল্যায়নে আসতে পারবেন না। আবার ভবিষ্যতে কেউ অভিযুক্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারাবাহিক কাজের অংশ হিসেবে পদোন্নতি বোর্ড কাজ করবে।
