সুনামগঞ্জের যাদুকাটা নদীর দুটি বালুমহাল থেকে বালু উত্তোলনের দায়িত্ব পেয়েছেন তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির এক নেতা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে ক্ষতিগ্রস্ত ইজারাদার হিসেবে নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। তবে প্রকাশ্য দরপত্র ছাড়াই এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক এক ইজারাদার।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নাছির মিয়াকে যাদুকাটা-১ ও যাদুকাটা-২ বালুমহালের দখল বুঝিয়ে দেন। নাছির মিয়া তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলন করতে পারবেন। এ জন্য গত তিন বছরের গড় বাজারমূল্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ১২ শতাংশ হারে দর নির্ধারণ করা হয়েছে। অবশিষ্ট সময়ের জন্য দুই বালুমহালের রাজস্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ৩৬ হাজার ৪২২ টাকা।
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দের জন্য যাদুকাটা নদীর বালুমহাল দুটি ১০৮ কোটি টাকায় ইজারা নিয়েছিলেন জিনান এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শাহ রুবেল আহমদ ও মেসার্স তাহিয়া স্টোন ক্রাশারের মালিক নাছির মিয়া। মামলাসংক্রান্ত জটিলতায় ইজারা নেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস পর তারা বালুমহাল দুটির দখল পান।
ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত দাবি করে আরও পাঁচ মাস বালু উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন দুই ইজারাদার। আদালত তাদের পক্ষে আদেশ দিলেও জেলা প্রশাসন এর বিরুদ্ধে আপিল করে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর আপিলের শুনানি শেষে রিটকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত নন বলে আদেশ দেন আদালত। এরপর জেলা প্রশাসন বালুমহাল দুটিতে বালু উত্তোলন বন্ধের বিজ্ঞপ্তি দেয়।
পরবর্তী সময়ে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের অবশিষ্ট সময়ের জন্য খাস আদায়ের মাধ্যমে বালুমহাল দুটি পরিচালনার উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। এ লক্ষ্যে ১৭ সেপ্টেম্বর জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা আহ্বান করা হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়।
এর মধ্যে দুই ইজারাদারই ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে অবশিষ্ট সময়ের জন্য বালু উত্তোলনের অনুমতি চান। ২২ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয় শুধু নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটি থেকে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
এদিকে, অনুমতি না পেয়ে শাহ রুবেল আহমদ ২৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্টে রিট করেন। আদালত ভূমি মন্ত্রণালয়ের আদেশ তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হলে রিট আবেদন প্রত্যাহার করা হয়। এরপর ১৫ অক্টোবর বালুমহালের আরেক সাবেক ইজারাদার রতন মিয়া একই বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। গত রোববার ওই রিটের কার্যকারিতা স্থগিত হয়। এর পরই মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বালুমহালটির সাবেক এক ইজারাদার বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আদেশে এভাবে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া যথাযথ হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী, জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রকাশ্য দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে ইজারা দেওয়া অথবা খাস আদায়ের ব্যবস্থা করার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তাপস শীল বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী নাছির মিয়াকে বালুমহাল দুটির দখল বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় তাদের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারেই প্রশাসন কাজ করেছে।
