আজকাল ওয়েবডেস্ক: যুদ্ধের অভিঘাত শুধু রণক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে যখন শহর ধ্বংস হয়, তখন ভেঙে পড়ে মানুষের সাজানো সংসারও। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ঘর ছাড়তে বাধ্য হন শিশু, মহিলা, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে অসংখ্য সাধারণ মানুষ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ইউরোপের সামনে ঠিক তেমনই এক ভয়াবহ মানবিক সঙ্কট তৈরি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে সবচেয়ে বড় শরণার্থী সঙ্কটগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে ইউক্রেনের এই বিপর্যয়।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশ ছাড়তে শুরু করেন লক্ষ লক্ষ মানুষ। কেউ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ আবার নিজের দেশেই নিরাপদ জায়গার সন্ধানে অন্যত্র সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের শরণার্থী সংক্রান্ত সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম কয়েক সপ্তাহেই ইউক্রেন ছেড়ে পালানো মানুষের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। ২০২২ সালের ৬ মার্চের মধ্যেই ১৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলিতে পৌঁছেছিলেন। সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপে এত শরণার্থী সঙ্কট আগে দেখা যায়নি। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, মলদোভা ও স্লোভাকিয়ার মতো দেশগুলি ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা মানুষের প্রধান আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পোল্যান্ডের সীমান্তে শরণার্থীদের দীর্ঘ লাইন সকলের নজরে এসেছে। বহু মানুষ সামান্য কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখেই দেশ ছাড়েন।
রুশ হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবর্ষণ, আবাসিক এলাকা এবং পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলেছে। বিদ্যুৎ, জল, স্বাস্থ্য পরিষেবা ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে বহু অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হয়েছে, ততই বেড়েছে নিরাপত্তাহীনতা এবং ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা। শরণার্থীদের বড় অংশই মহিলা ও শিশু। ইউক্রেনে বিধিনিষেধের কারণে যুদ্ধের শুরুর দিকে ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি বহু পুরুষের দেশ ছাড়ার সুযোগ কম ছিল। ফলে অনেকই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা দেশে থেকে গেলেও মহিলা ও শিশুরা নিরাপত্তার খোঁজে সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেন।
ইউক্রেনের শরণার্থী সঙ্কটের অভিঘাত শুধু দেশটির মধ্যেই আটকে থাকেনি। প্রতিবেশী দেশগুলির উপর বিপুল সংখ্যক মানুষের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার চাপ তৈরি হয়। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা জরুরি ত্রাণ, অস্থায়ী আশ্রয় এবং স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। পোল্যান্ডের মতো দেশগুলিতে সীমান্তবর্তী এলাকায় শরণার্থীদের সহায়তা করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। তবে এই সঙ্কটের সবচেয়ে কঠিন দিক হল, শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ এখনও যুদ্ধের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। যাঁরা দেশ ছেড়েছেন, তাঁদের অনেকের কাছেই ফিরে যাওয়ার মতো নিরাপদ বাসস্থান নেই। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বসতবাড়ি, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং নিরাপত্তার অভাব তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ ফের একবার দেখিয়ে দিয়েছে, সব কিছুতে বড় মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় মিললেও যুদ্ধের ক্ষত সহজে মুছে যায় না।
