সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিকৃতি এবং তাঁর সাহিত্য ও স্মৃতির প্রতীকী দৃশ্যপট।ছবি: সংগৃহীত
Published on
:
4 min read
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন
অভিরূপ মুখোপাধ্যায়
‘কবিতা আমার সারা জীবনের স্বীকারোক্তি, যা আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে’, বলেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। স্বীকারোক্তি? হ্যাঁ তাই। মানুষের খণ্ড-খণ্ড চরিত্রের মধ্যেই ছড়িয়ে থাকে তার জীবন। যেমন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে আমরা মূলত চিনি প্রখ্যাত ঔপ্যন্যাসিক-কবি, ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্পাদক ও তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তার জন্য। কিন্তু জীবনের প্রতি মুহূর্তে যে-সুনীল, যিনি কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী, কারও বন্ধু— জীবনের সেইসব ব্যক্তিগত চরিত্রে তিনি কেমন ছিলেন, তা আমরা সেভাবে জানি কি? ‘নিজের কাছেই একটু একটু অপরিচিত’ কাব্যগ্রন্থের সাতটি কবিতার সমন্বয়ে তৈরি একটি কবিতাগুচ্ছে দেখা যায়, সন্তান বিদেশে পড়াশোনার জন্য চলে যাচ্ছে বলে মা-বাবা নিভৃতে কষ্ট পাচ্ছেন। সে-কষ্টের লিখিত-শব্দ এমন, ‘পুপলু চলে যাবে বলে স্বাতীর মনখারাপ/অথচ স্বাতী চায় ছেলে বিদেশে গিয়ে/পড়াশোনা করুক/স্বাতী ছেলেকে ধরে রাখতে চায় না/আবার চোখের জলও ফেলছে’। আরেকটি কবিতায় সুনীল লিখছেন, ‘দু-দিনের জন্য পুপলু, স্বাতী আর আমি শান্তিনিকেতনে/এরপর পুপলু আর অনেকদিন আমাদের সঙ্গে থাকবে না/দু-দিন কিছু লেখা হল না’। এই গুচ্ছের ৪ সংখ্যক কবিতায় রয়েছে, ‘...পুপলু চলে যাবে/তাই অনেকে দেখা করতে আসছে/কিন্তু আমাকে যে লিখতেই হবে/আমি বেড়ালছানার মতন লেখার কাগজপত্র নিয়ে/একবার এ-ঘর আর একবার অন্য ঘরে গিয়ে/ঘাড় গুঁজে বসছি’। পুপলু, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ডাকনাম। ওই কবিতাগুচ্ছটির নাম কী? ‘এক সন্তান’। লক্ষণীয়, কবিতাগুলিতে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থিত রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখকজীবন এবং সেই লেখক-জীবনের সমতায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর বেদনাতুর পিতৃত্ব!
সেই সময়ের স্মৃতি-প্রসঙ্গ জানতে চেয়েছিলাম শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে, তিনি বললেন, ‘বিদেশে চলে আসার আগে, আমি-মা-বাবা, আমাদের শান্তিনিকেতনের বাড়িতে কিছুদিন সময় কাটাতে গিয়েছিলাম। শুধু শান্তিনিকেতন নয়, ওই সময় বাঁকুড়া-বিষ্ণুপুরেও আমরা ঘুরতে যাই। তখন বুঝিনি আমার বিদেশে চলে আসায় বাবা-মা কষ্ট পাচ্ছেন। অনেক পরে, খাতার মার্জিনের পাশে লিখে রাখা এই কবিতাগুলি পড়েছি। এখন শুধু মনে হয়, আরেকটু একসঙ্গে থাকলে খুব ভালো হত!’
সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। আর, সে-ভ্রমণের উপাদান ঢেলে দিয়েছেন নিজের লেখার ভেতর। শৌভিক যখন ছাত্রাবস্থায় আমেরিকায় রয়েছেন, তখন তাঁর কাছে যেতেন সুনীল? ‘আমেরিকা একটি বৃহৎ দেশ। অনেক সময় এমন হয়েছে বাবা এসেছেন আমেরিকার ওয়েস্টকোস্টে আর আমি রয়েছি ইস্টকোস্টে। ফলে, দেখা হয়নি। হয়তো একটা পোস্টকার্ড পাঠিয়েছেন। কিন্তু একটা সময়ের পর থেকে বাবা-মা নিয়মিত আসতেন। আমার ছেলে হওয়ার পর তো খুবই আসতেন। থাকতেন দু-তিন মাস। এখানেও এসেও বাবার ব্যস্ততা কমত না। বিপুল লেখার চাপের মধ্যে থাকতেন বাবা। ওঁরা আসতেন গরমকালে। মনে আছে, আমার বাড়ির বারান্দায় সকাল থেকে সারা দুপুর বাবা লিখতেন। কোনও এয়ার কন্ডিশনার ছিল না, শুধু ওঁর পাশে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান চলত। সন্ধেবেলা থাকত বিভিন্ন সাহিত্য-অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ। এর মধ্যেই আমরা কখনও-কখনও ঘুরতে যেতাম। এভাবেই আমরা গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন গিয়েছি, লাস ভেগাস গেছি। মনে আছে, লাস ভেগাসে গিয়ে বাবা খুব আনন্দ পেয়েছিলেন। সে-সময়, জুয়ো খেলার মেশিনের সামনে বসে কিছু পয়সা ঢুকিয়ে হাতল টানতে হত, জিতলে অনেক পয়সা পড়বে, আর হারলে কিছুই পড়বে না। বাবা একবার বেশ অনেক টাকা জিতে খুব মজা পেয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘আজকের ডিনারটা আমি খাওয়াব’।’ কাকাবাবু-র স্রষ্টা যিনি, ছোটদের জন্য কত আশ্চর্য সব লেখা লিখেছেন, সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যক্তিজীবনে ‘দাদু’ হিসেবে কেমন ছিলেন? শৌভিক জানালেন, ‘আমার ছেলের তখন তিন-চার বছর বয়স, লেখার কাজ সেরেই বাবা এখানে সারাক্ষণ ওর সঙ্গেই ঘুরতেন। নাতি আইসক্রিম-বিক্রেতা সেজে আইসক্রিম বিক্রি করছে, আর আমার মা-বাবা রয়েছেন ওর ক্রেতার ভূমিকায়। বাবা আদর করে বলতেন, ‘এই নাও পয়সা নাও, রেগে যাচ্ছ কেন?’— আমি বাবাকে এইভাবে বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে এর আগে কখনও দেখিনি।’ শৌভিক নিজের ছোটবেলায় কেমনভাবে দেখেছিলেন বাবাকে? জানতে চাই, ‘অল্পবয়সে বাবা কখনও আপনাকে পড়তে বসিয়েছেন?’ উত্তর, ‘না, বাবা কখনও আমাকে স্কুলের পড়াশোনা করাননি। খুব ছোটবেলায় বাবা একবার আমাকে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করানোর জন্য ‘মেঘনাদবধকাব্য’ পড়াতে শুরু করেছিলেন। আমি মুখস্থ করতাম আর তারপরে বাবা আমাকে বাক্য ধরে-ধরে মানে বোঝাতেন।’ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়াচ্ছেন ‘মেঘনাদবধকাব্য’, এমন শৈশব দেখে আশ্চর্য হতে হয়! ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে ভোরের দিকে হাঁটতে যেতেন শৌভিক। তাঁর একটি লেখায় খুঁজে পাওয়া যায় এই স্মৃতি-পর্যবেক্ষণ, ‘মর্নিং ওয়াক ফেরৎ একটা গল্প। ওই দিন ঢাকুরিয়া লেক থেকে ফেরার পথে বাবা ঠিক করলেন বাস ধরবেন। আমরা সাদার্ন অ্যাভিনিউয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ একটা বাস চোখে পড়ল বাবার। স্ট্যান্ড থেকে ছাড়ার মুহূর্তে বাবা ছুট দিলেন বাসের দিকে। লাফিয়ে উঠে পড়লেন। আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছি। বাবাও বাসের গেটে দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন, আমি তখনও ফুটপাতে ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছি। আমার দিকে এমন একটা নজরে বাবা সেদিন তাকিয়েছিলেন, দেখে মনে হল বাবা বোঝাতে চাইছেন, আমি এই গুন্ডামির গুণটুকুও পাইনি।’ মনে পড়ে যেতে বাধ্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একদিন লিখেছিলেন, ‘চলন্ত বাসের পাদানিতে তোমার ও আমার মধ্যে/কে আগে পা রাখতে পারে/সে-খেলাটি কি তোমার পছন্দ?’
জীবনের শেষের দিকের কবিতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘স্বাতী, মা তোমাকে এত ভালবাসতেন বলে/তোমাকে আরও বেশি ভালবাসতে ইচ্ছে করছে/...যেন তোমার হাতটা একবার ধরলেই/মা-কে আমার একটুখানি ছোঁয়া’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আজীবনের লেখায় মা-র কথা বারবার ফিরে এসেছে। ‘আমার ঠাকুমার অনেক গুণ বাবার মধ্যে ছিল। তাঁর মধ্যে অন্যতম হল উদারতা, সকলকে ভালোবাসা, এবং ঠাকুমার মতো বাবাও কখনও রাগতেন না।’ যদিও-বা রাগতেন, সেই ক্রোধকে কীভাবে সংবরণ করতেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? জয় গোস্বামী ‘গোঁসাইবাগান’-এ লিখছেন, সে-সময় পুজো সংখ্যার লেখা নিয়ে অসম্ভব চাপের মধ্যে রয়েছেন সুনীল। একাধিক উপন্যাস, গল্প, কবিতা লিখতে হচ্ছে তাঁকে। ‘দেশ’ পত্রিকার প্রবাদপ্রতিম সম্পাদক সাগরময় ঘোষ শারদীয়ার কবিতার জন্য তাঁকে তাগাদা দিচ্ছেন। এর মধ্যেই একদিন অফিস থেকে বাড়ির পথে একসঙ্গে বেরিয়েছেন দু-জন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেদিন গাড়ি আনেনি। ট্যাক্সি ধরবেন। পরপর ট্যাক্সি ‘না’ বলে চলে যাচ্ছে। পঞ্চম ট্যাক্সিও ‘না’ বলার পর, কী হল? জয় লিখছেন, ‘যাবে না মানে? কেন যাবে না? সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে, একটা ঝাঁকুনিতে সুনীলদা খুলে ফেলেছেন সামনের দিকের দরজা। একটা পা তুলে দিয়েছেন ভেতরে। একেবারে অন্য একটা মূর্তি মানুষটার।... হঠাৎ পা তুলে নিলেন সুনীলদা। একটা তীব্র প্রত্যাখানের জোর আওয়াজে বন্ধ হয়ে গেল দরজা। ‘যাও’ বললেন শুধু।... আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। একটুক্ষণ নীরবতার পর আবার নিজের শান্ত, মৃদুস্বরে বললেন, ‘আজ রাত্রে বাড়ি গিয়ে কবিতা লিখতে হবে। আজ তো রাগ করলে চলবে না, তাই না! দেখি, কখন ট্যাক্সি পাই!’ নিজেকে ক্রোধকে সংবরণ করার ক্ষেত্রে, যে-কোনও লেখকের কাছে এ-এক শিক্ষণীয় ঘটনা!
এখন যদি দেখা হত কী বলতেন বাবাকে? শৌভিক গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘বাবা বহু নতুন কবির কবিতা সংশোধন করে প্রকাশের ব্যবস্থা করতেন। এর ফলে, যাঁরা সত্যিই ভালো লেখেন, তাঁদের যেমন লাভ হয়েছে, পাশাপাশি বহু অযোগ্য মানুষও খ্যাতির আলো পেয়েছেন। এখন দেখা হলে বাবাকে বলতাম, কবিদের ভালবেসে এটা করেছ, বুঝি, কিন্তু এর দ্বারা আদতে বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি-ই হয়েছে।’ আসলে কবিতা ও কবিরাই ছিলেন তাঁর পরমআত্মীয়। ১৯৫৪ সালে, ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায়, ‘কৃত্তিবাসের এক বছর’ নামক প্রবন্ধে শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, আলোক সরকার, উৎপল কুমার বসু এমন অনেকের কবিতার কথা বলতে-বলতে শেষে পৌঁছে নবীন কবিদের উদ্দেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আধুনিক কবিতা যাঁরা লিখবেন তাঁদের আধুনিক কবিতার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সজাগ থাকা প্রয়োজন। এ-বিষয়ে যাঁরা উৎসাহী তাঁরা ‘কৃত্তিবাস’ ছাড়াও ‘কবিতা’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘সাহিত্যপত্র’, ‘পরিচয়’ প্রভৃতির সঙ্গে সংযোগ রাখতে পারেন।’ নিজের পত্রিকার পাতায় একজন সম্পাদক নতুন কবিদের নিয়মিত অন্য পত্রিকাও পড়ার পরামর্শ দিচ্ছেন, এমন অকৃপণ সৌজন্য আজকের দিনে বিরল। ৭ সেপ্টেম্বর, ৯১ বছর পূর্ণ করলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। জন্মদিনে, তাঁকে আমাদের প্রণাম!
