২০১০ সালের অক্টোবরে দ্য ইকোনমিস্ট পত্রিকার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলÑ‘কীভাবে ভারতের প্রবৃদ্ধি চীনকে ছাড়িয়ে যাবে’। এতে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মডেলের তুলনায় ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠী, গতিশীল বেসরকারি খাত এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুবিধাজনক দিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সে সময় আইএমএফ ভারতের প্রবৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ৭ শতাংশের কাছাকাছি হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল এবং তখন চীনের প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৫ শতাংশÑঅর্থাৎ ব্যবধান কমে আসছিল।
বিজ্ঞাপন
ভারতে তখন আশাবাদ কাজ করছিল। অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, ভারত চীনকে ছাড়িয়ে যাবে এবং সমৃদ্ধির এক নতুন যুগের সূচনা করবে। ২০১০ সালে চীনের জিডিপি ভারতের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি ছিল (৬ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বনাম ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার)। ২০২৫ সালে এসে এই ব্যবধান বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ৯ গুণে দাঁড়ায়, যেখানে চীনের জিডিপির পরিমাণ ছিল ১৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ভারতের মাত্র ৪ ট্রিলিয়ন ডলার।
২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয়ের ব্যবধানও বেড়েছে। চীনের মাথাপিছু জিডিপি ৪,৫০০ থেকে বেড়ে ১৩,৮৬২ ডলারে উন্নীত হয়েছে, ভারতে তা ১,৩৫০ থেকে বেড়ে ২,৭০২ ডলারে পৌঁছেছে। ফলে ব্যবধানটি ৩ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫ দশমিক ১ গুণে দাঁড়িয়েছে। মূল কথা এই নয় যে, ভারত কিছুই অর্জন করেনি, বরং বিষয়টি হলোÑভারতের প্রচার করা ভাবমূর্তি এবং প্রকৃত সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান বেড়েছে। ভারত সক্ষমতা গড়ে তোলার চেয়ে শক্তি প্রদর্শনের পেছনেই বেশি রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করেছে।
ভাবমূর্তির রাজনীতি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মনে করেন, আধুনিক রাজনীতিতে ভাবমূর্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং এর ভালো প্রতিদান পাওয়া যায়। একটি জমকালো সম্মেলন আয়োজন, প্রবাসীদের নিয়ে বিশাল সমাবেশ, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলিঙ্গনরত ছবি, নতুন কোনো স্লোগান এবং বড় কোনো ঘোষণাÑএসবের মাধ্যমেই ভারতের উত্থান সম্পর্কে একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি সহজেই গড়ে তোলা যায়।
কিন্তু প্রতীকী কর্মকাণ্ড বা বাগাড়ম্বর দিয়ে সক্ষমতা তৈরি হয় না। কাজের বাস্তব ফলের পরিবর্তে শুধু প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে যখন আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে, তখন তা মিথ্যা অহংকারে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। যেমনটা দেখা যায়, ভারতের ‘বিশ্বগুরু’র ইমেজ তৈরির ক্ষেত্রে, যেখানে প্রকৃত সক্ষমতা অর্জন করা ছাড়াই শক্তি প্রদর্শনের বিভ্রম তৈরি করা হয়।
‘লোয়ি ইনস্টিটিউট এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্স’-২০২৫ অনুযায়ী সামগ্রিক ক্ষমতার বিচারে এশিয়ায় ভারত তৃতীয় আছে স্থানে। তবে একই সূচক এটাও বলছে যে, ভারতের যে পরিমাণ সম্পদ ও সামর্থ্য আছে, তার তুলনায় আঞ্চলিক প্রভাবের মাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম। এমনকি এই সূচকের ইতিহাসে ভারতের ‘পাওয়ার গ্যাপ’ বা ক্ষমতার ব্যবধান এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোদির ভারতের ক্ষেত্রে এটিই এক বড় বৈপরীত্য। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ জিডিপির পরিসংখ্যানে নয়, বরং ভারতীয়রা কোথায় তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছে, এর মধ্যেই নিহিত।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কোটি ৮৫ লাখের বেশি ভারতীয় বিদেশে বসবাস করছেন এবং ভারত বিশ্বের সর্বোচ্চ পরিমাণ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় গ্রহণকারী দেশ (২০২৫ সালে যার পরিমাণ প্রায় ১৫০ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার)। প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সফল গোষ্ঠীটি হলো ভারতীয়-আমেরিকানরা। অনেক প্রবাসী ভারতীয়ই তাদের এই সাফল্যের জন্য গর্ববোধ করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑএই সাফল্যের কতটা তাদের নিজস্ব প্রচেষ্টায় অর্জিত?
তারা আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করে সে দেশের কোম্পানিগুলোতে চাকরি পেয়েছেন, সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার করেছেন এবং সেখানেই বসবাস করছেন। তাদের সাফল্যের ভিত্তির বড় একটি অংশ গড়ে দিয়েছে আমেরিকান সিস্টেম অথচ তারা পুরো কৃতিত্বটাই নিজেদের বলে দাবি করেন। যুক্তরাষ্ট্রে এইচ-১বি ভিসার নিয়মকানুন কঠোর করা এবং আইটি ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে ‘পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম’ থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনা মনে করিয়ে দেয় যে, বিদেশে সাফল্য মূলত সেই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপরই নির্ভর করে। যখন ভারত ছেড়ে যাওয়াই ভারতীয়দের সাফল্যের প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায়, তখন জাতীয় উন্নয়নের ধারণাটি নিয়ে আমাদের অবশ্যই প্রশ্ন তোলা উচিত।
মোদি সক্ষমতা নয়, বয়ান তৈরি করেছেন
২০১৪ সাল থেকে মোদিপ্রবাসী ভারতীয়দের একটি শক্তিশালী কূটনৈতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। বিদেশে তাদের সমর্থন ও সাফল্যকে তিনি একটি উদীয়মান ‘নতুন ভারত’-এর প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ২০১৯ সালের ‘হাউডি মোদি’ সমাবেশটি ছিল এই কৌশলেরই প্রতীক। তবে প্রবাসী ভারতীয়দের সাফল্য শুধু ভারতীয় মেধারই প্রতিফলন নয়, বরং তারা যেসব বিদেশি ব্যবস্থায় নিজেদের বিকশিত করেছেন, সেই ব্যবস্থাগুলোর সক্ষমতারও পরিচয় বহন করে। এটি অবশ্যই ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা বা তার প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যের প্রতিফলন নয়। ভারতের ‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তিটি মূলত দেশের বাইরে অর্জিত প্রবাসী ভারতীয়দের বৈশ্বিক সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে।
ভারত যখন নিজের উত্থানের বয়ান নিয়ে ব্যস্ত, চীন তখন মনোযোগ দিচ্ছে সক্ষমতা অর্জনের ওপর। গত কয়েক দশক ধরে দেশটি নিরলসভাবে শিল্প, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। ভারত যখন নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে ঘোষণা করল, তখন চীন তার জবাবে এক অভাবনীয় প্রযুক্তিগত উল্লম্ফন ঘটাল আর তা হলো ‘ডিপসিক’ নামের এআই মডেল যা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে।
এখন আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে বাস করছি। যারা এআইয়ের প্রতিযোগিতায় জয়ী হবে, তারাই হবে পরবর্তী পরাশক্তি। অথচ বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ ভারত এআই বিপ্লব থেকে পিছিয়ে আছে। কিন্তু তা মেধার অভাবে নয়, বরং বছরের পর বছর নিজেদের এআই সাম্রাজ্য গড়ার পরিবর্তে আমেরিকার এআই সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য মেধা জোগান দেওয়ার কারণে।
নিজ দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার মতো জনশক্তি বা মেধা থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর বা কর্মী হিসেবে কাজ করাকে বেছে নিচ্ছেন ভারতীয়রা। উদাহরণস্বরূপ, গুগল ও মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সুন্দর পিচাই ও সত্য নাদেলার কথা বলা যায়। বৈশ্বিক করপোরেট ক্ষমতার শীর্ষে ভারতের অবস্থানের ক্ষেত্রে তারা অসাধারণ দৃষ্টান্ত।
তবে সাফল্যের বিকল্প চিত্রও আছে। ৩২ বছর বয়সি চীনা নাগরিক ইয়াং ঝিলিন আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে গুগল ব্রেইন ও মেটার মতো আমেরিকান প্রযুক্তি-পরিবেশে কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি চীনে ফিরে এসে ‘মুনশট এআই’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং আজ তার কোম্পানির ‘কিমি কে৩’ এআই মডেল যুক্তরাষ্ট্রের অ্যানথ্রোপিক ও ওপেন এআইয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় মডেলগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে। ব্লুমবার্গ ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় মডেল এবং চীনের মডেলগুলোর কার্যকারিতার মধ্য ব্যবধান কমে মাত্র ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
একটি দেশ, যারা মেধা রপ্তানি করে এবং আরেকটি দেশ যারা সেই মেধাকে নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজে লাগায় ও ধরে রাখেÑএই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য এখানে স্পষ্ট। সুন্দর পিচাই এবং ইয়াং ঝিলিন উভয়েরই সাফল্যের গল্প অনুপ্রেরণাদায়ক, তবে তাদের মধ্যে একটি বৈপরীত্য আছে। সুন্দর পিচাই দেখিয়েছেন একটি অসাধারণ ব্যবস্থার মধ্য থেকে একজন মেধাবী ব্যক্তি কতটা উচ্চতায় উঠতে পারেন আর ইয়াং ঝিলিন দেখিয়েছেন কীভাবে একজন মেধাবী ব্যক্তি নিজেই একটি অসাধারণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারেন।
প্রযুক্তি খাতের পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করা কোনো দেশের জন্য দ্বিতীয় বিষয়টিই গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এআই-সংক্রান্ত পেটেন্ট অর্জনের ক্ষেত্রে চীন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত এআই পেটেন্টের প্রায় ৭৪ দশমিক ২ শতাংশই চীনের দখলে, যেখানে ভারতের অংশ মাত্র শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। এই পার্থক্যটিই দেখিয়ে দেয় ভারতের অবস্থান কোথায়। কোনো দেশ হয়তো এআই সম্মেলন আয়োজন করে সেখানে শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের আমন্ত্রণ জানাতে পারে, বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণাও দিতে পারে, জাতীয় কর্মসূচি চালু এবং সরকারি প্রতিটি ভাষণে ‘এআই’-এর কথা উল্লেখ করতে পারে। কিন্তু এসবের মাধ্যমেই প্রযুক্তি খাতের পরাশক্তি হওয়া যায় না।
পরাশক্তি গড়ে ওঠে প্রকৃত কাজের বা শক্ত ভিত্তির ওপর, শুধু স্লোগান দিয়ে নয়। অথচ মোদির শাসনামলে কাজের চেয়ে স্লোগানই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ভারতে প্রযুক্তিগত মেধার অভাব নেই, কিন্তু তার বড় একটি অংশ বিদেশে গিয়ে উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে। ভারতের বিদেশে আরো অনেক ‘সুন্দর পিচাই’-এর প্রয়োজন নেই, বরং দেশে বসেই বিশ্বমানের প্রযুক্তি গড়ে তুলতে সক্ষম অনেক ‘ইয়াং ঝিলিন’-এর প্রয়োজন। যতদিন না তা ঘটছে, ততদিন ভারতের পরাশক্তি হওয়ার স্বপ্ন শুধুই অলীক কল্পনায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে, অথচ সেই সময়ে বিশ্ব দ্রুতগতিতে সামনে এগিয়ে যাবে। সম্ভবত এ কারণেই ভারতীয় লেখক ও রাজনীতিক শশী থারুর একবার বলেছিলেন, ‘ভারতে সবকিছুই পুনর্ব্যবহৃত, এমনকি স্বপ্নগুলোও’।
এশিয়া টাইমস অবলম্বনে মোতালেব জামালী
