সংবাদ · টেক
চিকিৎসায় এআই, প্রযুক্তির সঙ্গে বাড়বে দায়িত্বও
১৮/১০/২০২৬

প্রযুক্তি এখন শুধু আমাদের দৈনন্দিন জীবন বদলাচ্ছে না, স্বাস্থ্যসেবার ধরনও পরিবর্তন করছে। রোগের তথ্য বিশ্লেষণ, চিকিৎসাসংক্রান্ত ছবি পর্যালোচনা, হাসপাতালের প্রশাসনিক কাজ সহজ করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সহায়তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসছে—প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, চিকিৎসার সিদ্ধান্তে মানুষের দায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?আমার দৃষ্টিতে, ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এটি চিকিৎসকের পেশাগত বিচারবোধ ও দায়িত্বের বিকল্প নয়। একজন রোগীর চিকিৎসা শুধু পরীক্ষার ফল বা ডিজিটাল তথ্যের ওপর নির্ভর করে না। তার বয়স, আগের রোগের ইতিহাস, বর্তমান শারীরিক অবস্থা, ওষুধ ব্যবহারের বিবরণ এবং ব্যক্তিগত পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সেই তথ্য রোগীর ক্ষেত্রে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা মূল্যায়নের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পেশাগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দ্রুত সিদ্ধান্তই সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করলে বিভ্রান্তিকর ফল দিতে পারে। আবার প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত তথ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু রোগী বা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রযুক্তির কার্যকারিতাও ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসায় এমন প্রযুক্তি ব্যবহারের আগে এর নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব পরিবেশে কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, নিরাপত্তা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে মানবিক যোগাযোগের গুরুত্ব কমে যায় না। একজন রোগী শুধু তার পরীক্ষার ফল জানতে চান না; তিনি জানতে চান তার সমস্যার অর্থ কী, কী ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী। প্রযুক্তি চিকিৎসককে তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু রোগীর উদ্বেগ শোনা, চিকিৎসার বিকল্প ব্যাখ্যা করা এবং সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে সাহায্য করাও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে জটিল চিকিৎসার ক্ষেত্রে রোগী ও পরিবারের সঙ্গে পরিষ্কার যোগাযোগ অপরিহার্য।হাসপাতালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে শুধু নতুন প্রযুক্তি চালু করাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসক ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ, রোগীর তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, প্রযুক্তির ফলাফল যাচাই এবং ভুল শনাক্ত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও থাকতে হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, প্রযুক্তি বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে—এটি কি প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সময় কমাচ্ছে, প্রশাসনিক কাজ সহজ করছে, চিকিৎসকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে, নাকি নতুন জটিলতা তৈরি করছে? প্রযুক্তির মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত তার বাস্তব উপযোগিতা দিয়ে, শুধু আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে নয়।বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং দায়িত্বশীল ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। প্রযুক্তি যেন মানুষের জন্য নতুন বৈষম্য তৈরি না করে, সে দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য তথ্য, প্রশিক্ষিত কর্মী, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং কার্যকর নীতিমালা ছাড়া প্রযুক্তির সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। তাই হাসপাতালের নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি সেটিকে নিরাপদ ও কার্যকরভাবে ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা।আমার বিশ্বাস, ভবিষ্যতের সফল হাসপাতাল হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে নয়, মানুষের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উপায় হিসেবে ব্যবহার করবে। প্রযুক্তি চিকিৎসার কাজকে আরও কার্যকর করতে পারে, তথ্য বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে এবং কিছু প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রোগীর নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মূল উদ্দেশ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো নয়; মানুষের জন্য নিরাপদ, কার্যকর ও দায়িত্বশীল চিকিৎসা নিশ্চিত করা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই লক্ষ্য অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে, যদি এর ব্যবহার যথাযথ যাচাই, মানবিক বিবেচনা এবং জবাবদিহির সঙ্গে পরিচালিত হয়।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বাস্থ্যসেবাকে আরও উন্নত করার সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু সেই অগ্রগতির কেন্দ্রে থাকতে হবে মানুষকে—রোগীকে, চিকিৎসককে এবং তাদের পারস্পরিক আস্থাকে।লেখক: হেড অব ডিজিটাল (ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর), এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗