মির্জা ফয়সল আমিন, দেলাওয়ার হোসেন, খাদেমুল ইসলাম, আবদুল আলীম নিজামী, হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক
সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন। ভোটার সংখ্যা ৫ লাখের বেশি। তাদের মধ্যে প্রায় দেড় লাখ ভোটার হিন্দু ধর্মাবলম্বী। বিপুলসংখ্যক ভোটার এই আসনের জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। অতীতে তারা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিলেন! তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ধানের শীষের তখনকার প্রার্থী বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন পান। সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিভিন্ন মতবিনিময় ও পথসভায় তারা নানান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথা বলছেন। সর্বশেষ নির্বাচনের মতো এবারও তাদের সমর্থন পাবেন বলে আশা করছে দলটি। তবে তাদের কর্মকাণ্ডের দিকে তীক্ষ দৃষ্টি রাখছে জামায়াতে ইসলামী। হিন্দু ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছেন। দিচ্ছেন চাঁদাবাজমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়ার প্রতিশ্রুতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের মোট ভোটার ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজারের বেশি ভোটার হিন্দু ধর্মাবলম্বী, যা মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। অতীতের নির্বাচনের হিসাব বলছে, এই এলাকার হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা কোনো দলের প্রার্থীকে জোটবদ্ধভাবে ভোট দিলে তার বিজয় নিশ্চিত। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের প্রতি স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশেষ আস্থা ও ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল। তিনি তাদের প্রায় শতভাগ ভোট পেয়েছিলেন। এখন তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ায় আসনটিতে উপনির্বাচনে এবার তার ছোট ভাই বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিনের পক্ষে দলটির স্থানীয় নেতা-কর্মীরা হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম ও পাড়া-মহল্লায় দিনরাত গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তারা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ঠাকুরগাঁওয়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় তারা সব সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে ছিলেন। মতবিনিময় ও পথসভা করে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন– নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে তাদের মূল অগ্রাধিকার।
আরও পড়ুন
এই ভোটব্যাংক নিয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফয়সল আমিন। তিনি বলেন, ‘তারা এখন আর আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক নেই। ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় ইতোমধ্যে বিএনপির ওপর আস্থা রেখে তার ভালো প্রতিফলন পেয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে তারা বিএনপির পাশেই থাকবেন।’
অন্যদিকে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনও প্রচার-প্রচারণায় পিছিয়ে নেই। অতীত সমীকরণ বদলে দিয়ে সব হিন্দু ভোটারের নিজেদের দিকে টানতেভিন্ন কৌশল নিয়েছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ঘরে ঘরে গিয়ে বলা হচ্ছে, তারা বিজয়ী হলে এলাকায় কোনো চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে দেবেন না। সব সম্প্রদায়ের জানমালের শতভাগ নিরাপত্তার বার্তা নিয়ে তারাও এই ভোটব্যাংকে ফাটল ধরানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন।
১১ দলের মনোনীত জামায়াত প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, এবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভোটাররা তাকেই পছন্দের তালিকায় রেখেছেন। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ সময় ধরে আমি হিন্দু সমাজের সমস্যাগুলো নিয়ে কাজ করেছি। তাদের বোঝার চেষ্টা করেছি। তাদের জীবন-মান উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এবার তারা আমাকেই ভোট দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
এদিকে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্রঋণ এবং ইমাম-খতিবদের ভাতা ও বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, ‘ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে এ অঞ্চলকে শূন্য করে ফেলা হবে।’ ঠাকুরগাঁওকে বাঁচাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
গতকাল শনিবার দুপুরে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে ১১-দলীয় ঐক্যজোটের উদ্যোগে জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিএনপির সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে দুর্নীতি ও দলীয়করণ করা হয়েছে। দলের লোকজনকে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির দিন ফুরিয়ে আসছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দাঁড়িপাল্লার বিজয়ের মধ্য দিয়ে বিএনপিকে লাল কার্ড দেখাতে হবে। চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আগামী ২৯ তারিখ দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিয়ে প্রার্থীকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তিনি।
যদিও রাজনৈতিক নেতাদের কথার ফুলঝুড়ির মধ্যে নিজেদের সপে না দেওয়ার কথা জানিয়েছেন হিন্দু ভোটাররা। তারা যোগ্য প্রার্থীকেই নির্বাচন করবেন বলে জানিয়েছেন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ঢোলারহাট এলাকার বাসিন্দা কংগ্রেস সরকার বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ভেবেচিন্তে ভোটাধিকার প্রয়োগ করব। গত নির্বাচনেও আমাদের কিছু চাওয়া ছিল, এবারও আছে। আমাদের মূল চাওয়া- শান্তিতে বসবাস, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং জানমালের নিরাপত্তা। যে প্রার্থী আমাদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের আস্থা দিতে পারবেন, আমরা তাকেই বেছে নেব।’
ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের বাসিন্দা ডা. শুকদেব চন্দ্র দাস বলেন, ‘বিগত নির্বাচনে ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দু সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়েছে। তবে এবারও সেই ধারা অব্যাহত রেখে নির্দিষ্ট দলের দিকেই ঝুঁকবে এমনটা ভাবা ভুল হবে। হিন্দু সমাজ এখন অনেক বেশি সচেতন। নির্দিষ্ট দলের দিকে না গিয়ে এখন তারা প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনায় নিচ্ছে।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ঠাকুরগাঁও সদর, রুহিয়া ও ভূল্লী এলাকা নিয়ে গঠিত এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। আগামী ২৯ অক্টোবর ১৮৫টি ভোটকেন্দ্রের ৯৮৯টি বুথে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচার চলবে আগামী ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত।
এই উপনির্বাচনে পাঁচ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমিন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছেন দাঁড়িপাল্লা প্রতীক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. খাদেমুল ইসলাম পেয়েছেন হাতপাখা প্রতীক, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী পেয়েছেন বটগাছ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক পেয়েছেন ডাব প্রতীক।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনের আশা করছি। প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। কারও পক্ষ থেকে বড় কোনো অভিযোগ পাইনি। উপনির্বাচনে এবার পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সঙ্গে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
