রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে ইলিশের বাজার। সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। ক্রেতাদের একটি অংশ আসে শরীয়তপুর ও মাদারীপুর থেকে। বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদী এবং এর শাখা নদীগুলো থেকে ধরা ইলিশ এসব বাজারে বিক্রি হয় বলে জানিয়েছেন স্থানীয় জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, মা-ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও মাছ ধরা ও বিক্রি বন্ধ হয়নি, বরং মাছ শিকার থেকে শুরু করে বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ আদায় করছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র।
জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নদীর তীরবর্তী ছয়টি স্থানে রাতে ইলিশের নিলাম হয়। এসব বাজারে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার মাছ বিক্রি হয় বলে দাবি করেন তারা। এ ছাড়া প্রভাবশালীদের মাছ ধরার ট্রলারপ্রতি দুই হাজার টাকা এবং বিক্রি হওয়া মাছের দামের ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
জানা গেছে, মা-ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় ৮ অক্টোবর থেকে দেশের নদ-নদীতে ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা চলছে। এই সময়ে মাছ শিকার বন্ধ রাখতে মৎস্য বিভাগের পাশাপাশি কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন অভিযান চালাচ্ছে।
এদিকে হিজলার অন্তরবাম এবং মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা জানান, এসব এলাকায় জেলেরা বড় ট্রলারে দলবদ্ধভাবে মাছ ধরেন। অভিযানের খবর পেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বাধা দেন। এতে অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরতে যাওয়া কয়েকজন জেলে পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নদীতে ট্রলার নামানোর জন্য আকারভেদে প্রতিদিন দুই হাজার, চার হাজার এবং ছয় হাজার টাকা প্রভাবশালীদের দিতে হয়। এ ছাড়া মাছ বিক্রির সময় নিলাম কেন্দ্রেও অর্থ দিতে হয়। তাদের অভিযোগ, অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে অভিযানের খবর পাওয়া এবং আটক হলে ছাড়িয়ে আনতে আইনি ও প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় অভিযানে আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাদের অল্প কিছু টাকা জরিমানা গুনতে হয়।
স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হিজলা উপজেলার টুমচর নদীর পাড়ের বেবজিয়াপাড়া, আবুপুর লঞ্চঘাট, নাচোকাঠি, শংকরপাশা-কাকুড়িয়া, অন্তরবাম, চরকিল্লা, জানপুর এবং ৩ নম্বর মাছঘাট এলাকায় ইলিশের নিলাম বসে। এসব স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তি অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারের ইলিশের খোলা বাজার থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
তারা জানান, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ শিকার ও বিক্রির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রলার ও নিলাম কেন্দ্র থেকে সংগৃহীত অর্থ জমা হয় হিজলা উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরির কাছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ তাহের হোসেন ও আলাউদ্দিন আহমেদ নামে দুই ব্যক্তির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছানো হয়।
অভিযোগে বিষয়ে জানতে তাহের হোসেনের মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তাই তার বক্তব্য জানা যায়নি। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞার এই সময়ে হিজলায় মাছ বেচাকেনা হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। তবে এসব অপকর্ম কারা করছেন, তা আমার জানা নেই। আমাকে হেয় করতে একটি পক্ষ অপপ্রচার ছড়াচ্ছে। এসবের মধ্যে আমি নেই।’
আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরিও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। আমি কেন নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ শিকারে সহায়তা করতে যাব?’
অভিযানে আটক জেলেদের শাস্তি ছাড়াই ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘অভিযানে আটকদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড ছাড়া কাউকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি।’ তিনি বলেন, ‘নির্দিষ্ট কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযানে জনবল কম থাকলে এসব এলাকায় জেলেদের বাধার মুখে পড়তে হয়। এ ছাড়া মেঘনাসহ বরিশালের নদ-নদীর বিশাল জলরাশিতে অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান নেই। এ ছাড়া জেলেদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
