সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলায় প্রায় ৪৩০টি স্টল থেকে দৈনিক চাঁদা ও জামানত বাবদ কোটি কোটি টাকা আদায়, বিদ্যুৎ সংকট, শৌচাগার ব্যবহারে অতিরিক্ত ফি এবং অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ সংযোগসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে; এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী গুড় পুকুরের মেলায় স্টল বরাদ্দ, তাঁবু ও ডেকোরেশন, দৈনিক চাঁদা, বিদ্যুৎ বিল এবং শৌচাগার ব্যবহারের ফি আদায় নিয়ে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা মিলছে না। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংকটে ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসায়িক কার্যক্রম। এদিকে মেলার প্রায় ৪৩০টি স্টল থেকে দৈনিক চাঁদা ও জামানত বাবদ কোটি কোটি টাকা আদায়ের হিসাব সামনে এসেছে।

এসব অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে গত ৫ অক্টোবর সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন জুঁই হানি ফার্মের স্বত্বাধিকারী ও নারী উদ্যোক্তা নাহিদা আক্তার। আবেদনে তিনি জানান, স্টলের তাঁবুর জন্য ৭ হাজার টাকা, ডেকোরেশনের জন্য ৯ হাজার টাকা, ইট বাবদ ৫ হাজার টাকা, দৈনিক চাঁদা হিসেবে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং তিনটি লাইটের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া শৌচাগার ব্যবহারের জন্য প্রতিবার ১০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে, যা ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের বাড়তি আর্থিক বোঝার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাহিদা আক্তার ও অন্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য আলাদাভাবে টাকা নেওয়া হলেও সকাল ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যায় না। দিনের বড় একটি অংশ এবং রাতেও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বন্ধ থাকায় পণ্য সংরক্ষণ ও বিক্রয় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নিজস্ব পুঁজি ও পরিশ্রমে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতিতে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আচার-চাটনির দোকানদার আব্দুস সামাদ। তাঁর অভিযোগ, স্টলের তাঁবুর জন্য ২০ হাজার টাকা এবং ডেকোরেশনের জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। এ ছাড়া অফেরতযোগ্য জামানত হিসেবে ৩০ হাজার টাকা এবং দৈনিক চাঁদা বাবদ ৪ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে। দৈনিক চাঁদার মধ্যে পাঁচটি লাইটের জন্য দিতে হয় ৫০০ টাকা।
সূত্রমতে, গত ১ অক্টোবর থেকে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক পার্কে ২০ দিনব্যাপী এই মেলা শুরু হয়েছে। মেলায় ছোট-বড় প্রায় ৪৩০টি স্টল রয়েছে। প্রতিটি স্টল থেকে দৈনিক ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এ হিসাবে প্রতিদিন মেলা থেকে প্রায় ১২ লাখ ৯০ হাজার টাকা এবং ৩০ দিনে প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা আদায়ের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া জামানত বাবদ প্রায় এক কোটি টাকা আদায়ের কথাও জানা গেছে।
মেলায় স্থাপিত দোকানগুলোতে অনুমোদন ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ অনুমোদন ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহারে জননিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এদিকে মেলার কারণে পৌর এলাকার নবারুণ স্কুল, সরকারি মহিলা কলেজ ও বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, পথচারী এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিয়মিত চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু থাকা অবস্থায় মেলা বসায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও কমছে বলে দাবি করা হয়েছে।
মেলার বৈধতা, অর্থ আদায়ের রসিদ, দৈনিক ভাড়ার যৌক্তিকতা এবং বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। ঐতিহ্যবাহী এই মেলার সুনাম রক্ষা এবং ক্ষুদ্র ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তাঁরা।
