ঢাকার ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক চাহিদা পূরণে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক সচিবালয় প্রয়োজন—এ নিয়ে দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে শেরেবাংলা নগরের পুরনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের পরিকল্পনা নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পরিবেশ, কৃষি গবেষণা, জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনার সামগ্রিক বিবেচনায়। এলাকাটিতে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রয়েছে দেশের বেশ কয়েকটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। ফলে এখানে বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্তে প্রশাসনিক সুবিধার চেয়ে সবুজ পরিসর রক্ষা, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।
প্রশ্নটি কেবল আগারগাঁওয়ের একটি নির্দিষ্ট মাঠের ভবিষ্যৎ নিয়ে নয়; এটি ঢাকার ক্রমসংকুচিত উন্মুক্ত জায়গা ও বাসযোগ্যতার প্রশ্নও। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনসংখ্যার চাপ, জলাশয় ভরাট এবং সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় রাজধানীর পরিবেশগত ভারসাম্য ক্রমেই চাপে পড়ছে। উন্মুক্ত জায়গা মানেই খালি বা অব্যবহৃত জমি নয়। বৃষ্টির পানি ধরে রাখা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ, নগরে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকদের সুস্থ জীবনযাপনে এসব এলাকার ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে কংক্রিটে ঢাকা ঢাকায় যেসব এলাকা ‘হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’ বা নগর তাপদ্বীপ প্রভাব কমাতে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে, আগারগাঁওয়ের উন্মুক্ত সবুজ চত্বর তার অন্যতম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাজধানীজুড়েই এ অমূল্য প্রাকৃতিক ঢালগুলো দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
এ হারিয়ে যাওয়ার চিত্রটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দেশীয় নগর পরিকল্পনাবিদদের উদ্ধৃত তথ্যে অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে ফুটে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, নগরবাসীর জন্য জনপ্রতি অন্তত নয় বর্গমিটার উন্মুক্ত জায়গা থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকায় জনপ্রতি উন্মুক্ত জায়গার পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে এক বর্গমিটার; ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তা নেমে এসেছে শূন্য দশমিক ১১ বর্গমিটারে। এছাড়া, দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ৪১টিতে কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ নেই। এ ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, সংকটজর্জরিত রাজধানীতে অবশিষ্ট প্রতিটি সবুজ প্রান্তর কতটা অমূল্য। এমন বাস্তবতায় আগারগাঁওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকার একটি বড় মাঠের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে তার পরিবেশগত, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব যাচাই করা অপরিহার্য।
এ প্রেক্ষাপটেই মাঠটিতে সচিবালয় স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। গত ১৫ অক্টোবর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রস্তাবিত স্থানান্তরের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচি শেষে একটি প্রতিনিধি দল মাঠটি পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি দেয়। এ কর্মসূচি শুধু একটি জমির ব্যবহার নিয়ে আপত্তি নয়; বরং মাঠটির ভবিষ্যৎ, কৃষি গবেষণার সুযোগ এবং নগরের পরিবেশগত প্রয়োজন নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের উদ্বেগের প্রকাশ। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের বক্তব্য ও উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বেগের সঙ্গে কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ সরাসরি যুক্ত। কৃষি গবেষণা শুধু পরীক্ষাগারে সীমাবদ্ধ নয়। নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন, মাটির গুণাগুণ পর্যবেক্ষণ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিরূপণে মাঠপর্যায়ের গবেষণা অপরিহার্য। শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করতেও গবেষণার জমি প্রয়োজন। একবার কৃষি গবেষণার জমি হারিয়ে গেলে সমমানের বিকল্প জমি তৈরি করতে বিপুল সময়, অর্থ ও অবকাঠামো প্রয়োজন হয়। এ কারণে মাঠটির ব্যবহার, মালিকানা ও কৃষি গবেষণায় এর অবদান যাচাই না করে কোনো অকৃষি কাজে জমিটি হস্তান্তর করা হলে শিক্ষা ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া এলাকাটির প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্য, জনস্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়টিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আগারগাঁও ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় জাতীয় সংসদ ভবন, পাসপোর্টের প্রধান কার্যালয়, নির্বাচন কমিশন, পরিসংখ্যান ব্যুরো, পিএসসি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর পাশাপাশি রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি ইনস্টিটিউট, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এবং জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটসহ বিশেষায়িত চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। সারা দেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। সেখানে সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করা হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যানবাহন চলাচল ও জনসমাগমের কারণে যানজট আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি স্বাস্থ্যসেবার নির্বিঘ্ন চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
তবে সচিবালয় এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিলেই ঢাকার সব সমস্যা সমাধান হবে না। রাজধানীর মূল সংকট প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবনের মধ্যে নিহিত। তাই নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনাকে কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে না দেখে নগর বিকেন্দ্রীকরণের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ঢাকার ভেতরে আরো স্থাপনা গড়ে চাপ বাড়ানোর চেয়ে পূর্বাচল, ঝিলমিল কিংবা ঢাকা-আশুলিয়াসংলগ্ন এলাকায় বা ঢাকার সন্নিকটে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থাসম্পন্ন স্থানে সচিবালয় গড়ে তোলা অধিক যুক্তিযুক্ত হতে পারে। এতে মূল ঢাকার ওপর যানজট ও জনসংখ্যার চাপ কমানোর পাশাপাশি নতুন এলাকাগুলো পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাও বিকেন্দ্রীকরণের এ ধারণাকে সমর্থন করে। মালয়েশিয়া কুয়ালালামপুরের বাইরে পুত্রজায়াকে পরিকল্পিত প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। দক্ষিণ কোরিয়া সিউলের বাইরে সেজং শহরে কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তরের একটি অংশ স্থানান্তর করেছে। ব্রাজিলও ১৯৬০ সালে রিও ডি জেনিরো থেকে পরিকল্পিত শহর ব্রাসিলিয়ায় রাজধানী স্থানান্তর করেছে। তবে অন্ধভাবে আন্তর্জাতিক মডেল অনুকরণ না করে বাংলাদেশের ঘনবসতি, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও পরিবেশগত বাস্তবতা বিবেচনা করে নিজস্ব টেকসই সমাধান বের করতে হবে। যেকোনো বড় উন্নয়ন সিদ্ধান্তের আগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষা করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে আগারগাঁওয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পের একটি নিরপেক্ষ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ও যান চলাচল বিশ্লেষণ করা উচিত। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ এবং সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের সুফল ও কুফল জনসমক্ষে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
আগারগাঁওয়ের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠের ভবিষ্যৎ কোনো সাধারণ ইট-পাথরের ভবন নির্মাণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জাতীয় কৃষি গবেষণার ভবিষ্যৎ, জরুরি চিকিৎসাসেবার নির্বিঘ্নতা এবং সর্বোপরি ঢাকার পরিবেশগত স্থায়িত্ব। সচিবালয়ের বিকল্প ঠিকানা পরিকল্পিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, কিন্তু একবার হারিয়ে যাওয়া উন্মুক্ত সবুজ, সংকুচিত গবেষণার সুযোগ কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত নগর পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা কঠিন। তাই ঢাকার বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে সিদ্ধান্তটি হোক দূরদর্শী, তথ্যনির্ভর, পরিবেশবান্ধব ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার ভিত্তিতে।
মো. বশিরুল ইসলাম: কৃষিবিদ ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
