নজরুল ইসলাম

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তাব্যবস্থায় সামান্য অবহেলাও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জনের প্রাণহানি এই শোককে আরও গভীর করেছে। সমুদ্রসৈকতে আনন্দঘন অবকাশ কাটাতে গিয়ে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের এমন মর্মান্তিক পরিণতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পর্যটনের বিকাশ যেখানে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পর্যটকদের জীবনই যদি নিরাপদ না থাকে, তবে সেই বিকাশের সার্থকতা কোথায়?
১৭ অক্টোবর শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন ওই রিসোর্টে আগুনের সূত্রপাত হয়। কাঠের তৈরি ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই বের হওয়ার সুযোগ পাননি। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকাজে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় আহতও হয়েছেন কয়েকজন। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হলেও অগ্নিকাণ্ডের পর প্রকাশিত তথ্য বলছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিস আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে নোটিশ দিয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্সও ছিল না। এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করার পরও কীভাবে একটি পর্যটন রিসোর্ট কার্যক্রম চালিয়ে গেল? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি নিয়মিত তদারকি করেছে? অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি দূর না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ রাখার প্রয়োজন ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা জরুরি। শুধু নোটিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলে, তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। বৈদ্যুতিক ত্রুটি, গ্যাস সিলিন্ডার কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে কি না, তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবনের নির্মাণসামগ্রী, বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ এবং অতিথিদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা পরীক্ষা করা জরুরি। তদন্তের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে, যাতে প্রকৃত ঘটনা জানা যায় এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
বিশেষভাবে খতিয়ে দেখতে হবে, রিসোর্টে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ছিল কি না, সেগুলো সচল ছিল কি না এবং কর্মীরা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত ছিলেন কি না। প্রতিটি আবাসিক কক্ষ থেকে নিরাপদে বের হওয়ার বিকল্প পথ থাকা প্রয়োজন। ভবনে ধোঁয়া শনাক্তকরণ যন্ত্র, অ্যালার্ম, জরুরি আলোকব্যবস্থা ও স্পষ্ট নির্দেশনাও থাকতে হবে। শুধু কাগজে-কলমে নিরাপত্তাবিধি পূরণ করলেই চলবে না; বাস্তবে সেগুলো কার্যকর কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
এ দায় কেবল একটি রিসোর্টের মালিক বা ব্যবস্থাপনার নয়। ফায়ার সার্ভিস, স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং ভবন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রভাবশালী মালিক কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে কেউ যেন দায়মুক্তি না পান। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও সমীচীন নয়; আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় দায় নির্ধারণ করতে হবে।
কক্সবাজার দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র।
ইনানী, হিমছড়ি ও মেরিন ড্রাইভ ঘিরে গড়ে ওঠা হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক অবস্থান করেন। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ব্যবসায়িক সুবিধা নয়, এটি মৌলিক দায়িত্ব। তাই শুধু কক্সবাজার নয়, সারা দেশের হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও পর্যটনস্থাপনায় জরুরি অগ্নিনিরাপত্তা নিরীক্ষা চালাতে হবে। লাইসেন্স, বহির্গমনপথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ যাচাই করে ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত
বন্ধ রাখতে হবে।
নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে হবে। তবে শোকপ্রকাশ ও আর্থিক সহায়তাই শেষ কথা নয়। প্রয়োজন দায় নির্ধারণ, বিচার এবং কার্যকর সংস্কার।
টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিকাণ্ড যেন আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন, কয়েক দিনের আলোচনা এবং পরে বিস্মৃতির ঘটনায় পরিণত না হয়। মনে রাখতে হবে, প্রতিটি নিরাপত্তাবিধির পেছনে রয়েছে মানুষের জীবন; প্রতিটি অবহেলার পরিণতি হতে পারে একটি পরিবারের চিরস্থায়ী বিপর্যয়। পর্যটন ব্যবসার মুনাফার চেয়ে মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই এখনই সময় অগ্নিনিরাপত্তায় শূন্য সহনশীলতা, নিয়মিত তদারকি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। আর কোনো পরিবারকে যেন আনন্দভ্রমণে গিয়ে স্বজন হারানোর অসহনীয় বেদনা বহন করতে না হয়।

