দুর্গাপূজার আনন্দ নিমেষেই বিষাদে পরিণত হয়েছে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ভরতকাঠী গ্রামের শংকর বেপারীর পরিবারে। পূজা দেখে বাড়ি ফেরার পথে কালীগঙ্গা নদীতে ট্রলারডুবির ঘটনায় আট বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে অদ্রিতাকে হারিয়েছেন তিনি। এখনো নিখোজ রয়েছেন স্ত্রী রিনা বেপারী (৩৯)। মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হলেও তিন দিন ধরে স্ত্রীর কোনো সন্ধান না পাওয়ায় শোক ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে শংকরের।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার সীমান্তবর্তী শ্রীরামকাঠী-ভরতকাঠী ফেরিঘাট এলাকায় কালীগঙ্গা নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত যাত্রী ও ভারী মোটরসাইকেল বোঝাই একটি ট্রলার ডুবে গেলে এ হতাহতের ঘটনা ঘটে।
একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে আহাজারি করতে করতে শংকর বেপারী বলেন, ঘটনার আগের রাতেও মেয়ে আমার সঙ্গে ঘুমিয়েছে। আজ সে শুধু স্মৃতি। আমি কীভাবে রাতগুলো পার করব? নৌকাডুবির পর পরিবারের কাউকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। হাসপাতালসহ আশপাশের নদীতে খুজেছি। সবাই তীরে উঠলেও ওরা নিখোজ রয়ে যায়। এখন মেয়ে মারা গেছে, ওর মাও হয়তো বেঁচে নেই।
জানা গেছে, দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিমা দর্শন শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রলারে বাড়ি ফিরছিলেন শংকর বেপারী। ট্রলারটিতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ৫০ জনের বেশি যাত্রী এবং ছয় থেকে আটটি ভারী মোটরসাইকেল তোলা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত বোঝার কারণে ট্রলারটি ভারসাম্য হারিয়ে নদীতে ডুবে যায়। এ সময় অধিকাংশ যাত্রী সাতরে এবং স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও রিনা ও তার মেয়ে নিখোজ হন।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। প্রথম দফায় অভিযান চালিয়ে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল এসে দ্বিতীয় দফায় অভিযান চালায়। এ সময় নিখোজ শিশু অদ্রিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে তার মা রিনা বেপারীর সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি।
বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত দুর্ঘটনার তিন দিন পার হলেও রিনা বেপারীকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের ফায়ার ফাইটার মো. পারভেজ।
নিখোজ রিনা বেপারী নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠী গ্রামের বাসিন্দা। তার স্বামী শংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কর্মরত। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। পূজা দেখতে গিয়ে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে এখন স্ত্রীর অপেক্ষায় রয়েছেন শংকর।
দুর্ঘটনাস্থল ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিদর্শন করেন নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা, সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আহসান হাবিব এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নাসরিন জাহান। উদ্ধার অভিযানে পিরোজপুর জেলা ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক রায়হানুল আশরাফ ও নাজিরপুর ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক সোয়াইব হোসেন মুন্সি উপস্থিত রয়েছেন। পাশাপাশি নাজিরপুর ও নেছারাবাদ থানা-পুলিশের যৌথ দল ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছে।
নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশিক আহমেদ জানান, ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তীব্র পানির স্রোতের মধ্যেও দুই দফায় অভিযান চালিয়ে শিশু অদ্রিতার মরদেহ উদ্ধার করেছে। নিখোঁজ রিনা বেপারীকে উদ্ধারে ডুবুরি দলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা ১২টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল শ্রীরামকাঠী ও নেছারাবাদের ভরতকাঠী খেয়াঘাট এলাকা পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মনজুর। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী ও পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান।
একটি পরিবারের ঈদের মতো আনন্দের দুর্গোৎসব শেষ হয়েছে অপূরণীয় শোকে। একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে শংকর বেপারীর বুকফাটা আহাজারি আর নিখোজ স্ত্রীর অপেক্ষা এখন ভারী করে তুলেছে ভরতকাঠী গ্রামের পরিবেশ।
