৪৩ শতাংশ ছাত্রী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত, পুষ্টিকর খাবারে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব
মাহফুজুল ইসলামপ্রকাশ:
রোগীর জন্য পুষ্টিকর খাবারের পরামর্শ দেওয়া হলেও অনেকের পক্ষে সেই খাবার কেনা সম্ভব হয় না। চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ।
ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, জটিল রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার রাখলেও উচ্চমূল্যের কারণে তা অনুসরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ক্ষেত্রেও।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুষ্টিকর খাবারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তানভীর আহমেদ। পাশাপাশি শুল্ক কমানোর ফলে রাজস্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর কর বাড়ানোর বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি নিজের ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন এই পুষ্টিবিদ। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে খাবারের পুষ্টিমান বাড়াতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।

খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার, কিন্তু দাম নাগালের বাইরে
শিক্ষকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছেন তানভীর আহমেদ। রোগীর শারীরিক অবস্থা ও পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাদ্যতালিকা তৈরি করতে গিয়ে এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, মিষ্টিকুমড়ার বীজ, কিনোয়া ও অন্যান্য বীজের মতো খাবারের গুরুত্ব তাঁর অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে। জটিল রোগে আক্রান্ত অনেক রোগীর চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণে এসব খাবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব খাবারের বিকল্পও সীমিত।
কিন্তু খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় খাবারের নাম থাকলেই তা কেনা সম্ভব হয় না। উচ্চমূল্যের কারণে অনেক রোগীর পক্ষে নিয়মিত এসব খাবার কেনা কঠিন। ফলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ পেলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকের পক্ষে সেই অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব হয় না।
এ সমস্যা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক কমিয়ে সেগুলোর দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তানভীর আহমেদ। তাঁর পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এ বিষয়টি পুষ্টি নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। পুষ্টিকর খাবার সম্পর্কে জানা ও পরামর্শ পাওয়ার পাশাপাশি সেগুলো কেনার সামর্থ্য থাকাও যে জরুরি, তা তাঁর প্রস্তাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শুল্ক কমলে রাজস্বের ভারসাম্য কীভাবে হবে?
পুষ্টিকর খাবারের ওপর শুল্ক কমানোর পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর খাবারে কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন তানভীর আহমেদ। তাঁর প্রস্তাব, কোমল পানীয়, ফাস্টফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর কর বাড়ানো হোক। পুষ্টিকর খাবারের শুল্ক কমানোর উদ্যোগের সঙ্গে রাজস্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে তিনি এ প্রস্তাব সামনে এনেছেন।
একদিকে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবারের দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে আনা, অন্যদিকে অস্বাস্থ্যকর খাবারে কর বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্বের ভারসাম্য রক্ষার সম্ভাবনা বিবেচনা করা তাঁর প্রস্তাবে এ দুটি দিকই গুরুত্ব পেয়েছে। এতে পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্য কমানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে একটি বিকল্প পথের কথাও উঠে এসেছে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টির সমস্যাও আড়ালে
রোগীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে তানভীর আহমেদের। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী অপুষ্টি ও অতিপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে প্রচ্ছন্ন অপুষ্টি বা ‘হিডেন ম্যালনিউট্রিশন’ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
শিক্ষার্থীদের খাদ্যতালিকায় বাদাম ও বিভিন্ন ধরনের বীজের মতো পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এসব খাবার রান্না ছাড়াই সহজে খাওয়া যায়। তবে দাম বেশি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পক্ষেও সব সময় এসব খাবার কেনা সম্ভব হয় না। তাঁর মতে, বাদাম ও বীজের মতো খাবার গুলো সুলভ মূল্যে পাওয়া গেলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে তা সহায়ক হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের পুষ্টির সংকট, রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ ছাত্রী
রোগীদের খাদ্যতালিকা তৈরির ক্ষেত্রে পুষ্টিকর খাবারের উচ্চমূল্য যেমন বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি শিক্ষার্থীদের পুষ্টির ক্ষেত্রেও খাবারের সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ। যবিপ্রবির ছাত্রীদের নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ ছাত্রী রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। এ তথ্যকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে তিনি শিক্ষার্থীদের পুষ্টিগত অবস্থার উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর মতে, পুষ্টিকর খাবার কেনার সামর্থ্য ও সেগুলোর সহজলভ্যতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হলে শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা মিলতে পারে।
ডাইনিংয়ে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করতে বিশেষ ভর্তুকির প্রস্তাব
শিক্ষার্থীদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ব্যক্তিগতভাবে খাবার কেনার সামর্থ্যের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে কী ধরনের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে, বিশেষ করে ছাত্রী হলের খাবারের পুষ্টিমান বাড়াতে বিশেষ ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন এই পুষ্টিবিদ।
তাঁর মতে, ডাইনিংয়ে সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবেন। এতে তাঁদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা করার পাশাপাশি সুস্থ ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার পথও সহজ হবে।
সরকারের উদ্যোগের প্রত্যাশা
দেশি ও বিদেশি ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তানভীর আহমেদ। একই সঙ্গে পুষ্টিকর খাবারের ওপর শুল্ক কমানো, অস্বাস্থ্যকর খাবারে কর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ে খাবারের পুষ্টিমান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন তিনি।
একজন ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে কাজ করতে গিয়ে যে সমস্যাগুলো তাঁর নজরে এসেছে, সেগুলোর সমাধানে নীতিগত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন তানভীর আহমেদ। তাঁর বিশ্বাস, পুষ্টিকর খাবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা করা গেলে দেশের স্বাস্থ্য খাত ও সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…
