চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (চাকসু) বিদায়ী সহসভাপতি (ভিপি) ইব্রাহিম হোসেন রনি বলেছেন, দায়িত্ব পালনকালে তিনি কোনো শিক্ষার্থীর জন্য হলের আসন সুপারিশ করেননি, চাকরি বা অন্য কোনো সুবিধা পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটাননি এবং অর্থের কোনো খেয়ানত করেননি। এসব অভিযোগের প্রমাণ দিতে পারলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন তিনি।
২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্র শিবির-সমর্থিত ‘সম্প্রীতির শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ইব্রাহিম হোসেন রনি। তিনি ৭ হাজার ৯৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদল-সমর্থিত প্যানেলের সাদ্দাজ হোসাইন হৃদয় পান ৪ হাজার ৩৭৪ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ৩ হাজার ৬০৯।
দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা, নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বার্তা২৪.কমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন চাকসুর ৭তম ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি।
শপথ অনুযায়ী আগামীকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) শেষ হচ্ছে চাকসুর মেয়াদ। ১৫ অক্টোবর চাকসুর ভিপি হিসেবে শেষ কর্মদিবসে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সীরাত মঞ্জুর, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, চট্টগ্রাম।
বার্তা২৪: চাকসুর ভিপি হিসেবে আজ আপনার শেষ কর্মদিবস। এই জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার অনুভূতি কি?
ইব্রাহিম রনি: ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আজকের দিনে, ১৫ অক্টোবর, প্রায় এক বছর আগে অনুষ্ঠিত চাকসু নির্বাচনের পর থেকে আমাদের দীর্ঘ পথচলার কথা মনে পড়ছে। এই সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতা, বাধা, ষড়যন্ত্র এবং গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছি। তবে সবকিছু মিলিয়ে অনেক চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।
আমরা দেখেছি, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে সামান্য সহযোগিতা করলে তারা কীভাবে ভালোবাসা উজাড় করে দেন। শিক্ষকদের সম্মান দিলে তারা একজন শিক্ষার্থী কিংবা ছাত্রপ্রতিনিধিকে কতটা স্নেহ করেন, সেটিও দেখেছি। মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দিলে বিরোধী পক্ষও বন্ধুতে পরিণত হতে পারে, সেই অভিজ্ঞতাও হয়েছে।
চাকসুর প্রত্যেক সম্পাদক কীভাবে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, ঘাম ঝরিয়েছেন, সেটি দেখেছি। সারা দেশের মানুষ আমাদের জন্য দোয়া করেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, পুরো বছর শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কর্মসূচি, সভা, সেমিনার ও আয়োজনে আমাদের পাশে ছিলেন। তাঁদের এই ভালোবাসা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মান।
বার্তা২৪: নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেগুলোর কতটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন বলে মনে করেন?
ইব্রাহিম রনি: আমরা ছাত্র-শিক্ষক সমাজ সমর্থিত সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোটের প্যানেল থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছিলাম। আমাদের প্যানেলের ২৬ জনের মধ্যে ২৪ জন নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমরা ৩৩ দফার ইশতেহার দিয়েছিলাম। এর মধ্যে প্রায় ২৫টি দফা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করেছি। তিনটি দফা ৯০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি দফাগুলোরও বিভিন্ন মাত্রায় অগ্রগতি হয়েছে।
আমাদের ইশতেহার ছিল অনেক বড়। অনেকের মনে হয়েছিল, এত প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? কিন্তু আমরা দেখিয়েছি, চেষ্টা করলে অনেক কিছুই সম্ভব।
স্বাস্থ্যসেবা, যাতায়াত, আবাসন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, ছাত্রী কল্যাণ, বিভিন্ন মেলা, সভা-সেমিনার, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা কাজ করেছি। সব মিলিয়ে চাকসুকে এমন একটি রোডম্যাপে দাঁড় করাতে পেরেছি, যেখান থেকে পরবর্তী প্রতিনিধিরা কাজ এগিয়ে নিতে পারবেন। তারা এই রোডম্যাপ অনুসরণ করলে আরও বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব বলে মনে করি।
বার্তা২৪: আপনার মেয়াদে শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন কোনটিকে মনে করেন? কেন?
ইব্রাহিম রনি: আমার মনে হয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ বছরের ইতিহাসে এমন কিছু কাজ প্রথমবারের মতো হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ব্যক্তিগত বই নিয়ে প্রবেশ করে পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করা। আগে শিক্ষার্থীরা নিজেদের বই নিয়ে সেখানে বসে পড়তে পারতেন না। চাকসুর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এবার সেই সুযোগ চালু হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার জন্য ৫০ লাখ টাকার বেশি মূল্যের একটি অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে। চাকসুর উদ্যোগে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণা উৎসব আয়োজন করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো ব্যাংকিং সেবা অনলাইনে নিয়ে আসার উদ্যোগ। এত দিন শিক্ষার্থীদের ব্যাংকে টাকা জমা দিতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হতো। গরমের মধ্যে তাঁদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো। আমরা সেই ভোগান্তি কমাতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে টাকা জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজেশনের কাজ এগিয়েছে। ফলাফল দেখা, মার্কশিট সংগ্রহ ও সনদ উত্তোলনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন এসেছে। এসব পরিবর্তন আমাদের মেয়াদে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে, এ জন্য আলহামদুলিল্লাহ।
বার্তা২৪: দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কী ছিল—প্রশাসনিক জটিলতা, অর্থসংকট, নাকি নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা?
ইব্রাহিম রনি: আমাদের নির্বাচন হয়েছিল জুলাই-পরবর্তী প্রশাসনের সময়ে। নির্বাচনের প্রায় পাঁচ মাস পর প্রশাসনে পরিবর্তন আসে। নতুন প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একটি পরিবর্তনকালীন পরিস্থিতির নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
প্রথমত, নির্বাচনের পর টানা পাঁচ মাস চাকসুকে কোনো বাজেট দেওয়া হয়নি। এরপর সীমিত পরিসরে বাজেট দেওয়া শুরু হয়। একজন সম্পাদক পাঁচ লাখ টাকা বাজেট চাইলেও তাঁকে দেওয়া হয়েছে ২৫ হাজার বা ৫০ হাজার টাকা। এভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে উপাচার্যের কাছ থেকে বাজেট আদায় করে কাজ করা অত্যন্ত কঠিন ছিল।
দ্বিতীয়ত, চাকসু ভবনে ভিপি হিসেবে বসার জন্য প্রয়োজনীয় চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত ছিল না। যে কক্ষে এখন বসে কথা বলছি, সেটি আগে সাংবাদিক সমিতির কক্ষ ছিল। বিভিন্ন ক্লাবের জন্যও কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে বিভিন্ন ক্লাব এসব কক্ষ ব্যবহার করছিল। সেগুলো উদ্ধার করে প্রায় তিন মাস পর আমরা চাকসু ভবনে বসতে পেরেছি।
আমার কাছে বিষয়টি দুঃখজনক মনে হয়েছে। নির্বাচন আয়োজন করা হলো, কিন্তু নির্বাচনের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কোথায় বসবেন, কীভাবে কাজ করবেন, কীভাবে বাজেট পাবেন—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। একটি ছাত্র সংসদ কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে আগেই একটি রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন ছিল।
আমি আশা করব, ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাকসু নির্বাচন আয়োজনের আগেই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাজের পরিবেশ, বাজেট ও দায়িত্ব পালনের কাঠামো নির্ধারণ করবে।
বার্তা২৪: শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কত অভিযোগ পেয়েছেন এবং এর মধ্যে কতগুলো নিষ্পত্তি করতে পেরেছেন? এ বিষয়ে কোনো পরিসংখ্যান আছে?
ইব্রাহিম রনি: চাকসুর বয়স যখন নয় মাস, তখন একটি পরিসংখ্যান করা হয়েছিল। সেখানে অন্যান্য ছাত্র সংসদের সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চাকসুর প্রতিনিধিরা সবচেয়ে এগিয়ে ছিলেন।
শিক্ষার্থীরা ফোনে, কার্যালয়ে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমাদের প্রতিনিধিদের কাছে যেতে পেরেছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সহজ ছিল। ছাত্রীদের হয়রানি ও নিরাপত্তার বিষয়েও চাকসুর অবস্থান তুলনামূলক ভালো ছিল বলে ওই পরিসংখ্যানে উঠে আসে। তবে অভিযোগের মোট সংখ্যা কিংবা কতটি অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান আমি এখানে দিতে পারছি না।
বার্তা২৪: এক বছরের দায়িত্ব পালনের পর এমন কোনো সিদ্ধান্তের কথা মনে হয়, যেটি আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল বা কোনো ভুল হয়েছিল?
ইব্রাহিম রনি: চাকসুর প্রতিটি সিদ্ধান্ত কার্যনির্বাহী সভায় আলোচনা করে নেওয়া হয়েছে। সারা বছর ধরে সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি।
তবে মনে হয়, উচ্চশিক্ষা ও বিসিএসকেন্দ্রিক সেমিনারগুলো বছরের শুরুতেই আরও বেশি আয়োজন করা উচিত ছিল। এখন পরীক্ষার চাপের কারণে অনেক শিক্ষার্থী এসব সেমিনারে অংশ নিতে পারছেন না, যদিও তাঁদের আগ্রহ রয়েছে। কিছু কোর্স শুরু করেও শেষ করা সম্ভব হয়নি। সেগুলো আরও আগে শুরু করতে পারলে ভালো হতো।
আরেকটি বিষয় হলো, চাকসুর বিভিন্ন সম্পাদক শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে অনেক কর্মসূচি আয়োজন করেছেন। কখনো এক দিনেই তিন-চারটি অনুষ্ঠান হয়েছে। কর্মসূচিগুলো বিভিন্ন দিনে ভাগ করে আয়োজন করলে শিক্ষার্থীরা আরও বেশি অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন এবং তাঁদের দক্ষতা উন্নয়নে তা বেশি কার্যকর হতো।
বার্তা২৪: চাকসুর পক্ষ থেকে যে অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়েছে, আপনারা দায়িত্ব ছাড়ার পর সেটি কে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে?
ইব্রাহিম রনি: প্রথমেই অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য ড. খালিদুজ্জামান ভাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসাসেবার উন্নয়নে আমরা দীর্ঘদিন ধরে তার সঙ্গে কথা বলেছি। শেষ পর্যন্ত তিনি আমাদের সহযোগিতা করেছেন।
অ্যাম্বুলেন্সটি চাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর কাগজপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে। তাই এর রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। পরিবহন বিভাগের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা বা মেডিকেল সেন্টারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাও এ বিষয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
বার্তা২৪: বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে আসনসংকট, গণরুম ও গেস্টরুমের সমস্যা রয়েছে। এসব সমাধানে চাকসু কি ভূমিকা রেখেছে?
ইব্রাহিম রনি: হলের গেস্টরুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারের কেউ কিংবা কোনো বন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে এলে তাঁদের বসানো, নাশতা করানো বা কিছুক্ষণ বিশ্রামের ব্যবস্থা করার জন্য গেস্টরুম প্রয়োজন। কিন্তু অতীতে ছাত্রলীগ এসব গেস্টরুমকে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীদের র্যাগিং, মারধর ও ভয়ভীতি দেখানো হতো।
আমরা সেই জায়গাগুলোকে জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নিয়েছি। চাকসুর উদ্যোগে গেস্টরুমগুলোতে ‘জুলাই স্মৃতি পাঠাগার’ স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে গল্প, বিভিন্ন ধরনের বই, ধর্মীয় বইসহ নানা বিষয়ের বই রাখা হয়েছে।
এখন শিক্ষার্থীরা গেস্টরুমে বসে বই পড়তে পারছেন। আমরা চেয়েছি, যেসব জায়গায় আগে শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতির মুখোমুখি হতে হতো, সেগুলো যেন জ্ঞানচর্চা ও সুস্থ পরিবেশের জায়গায় পরিণত হয়।
বার্তা২৪: নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছেন?
ইব্রাহিম রনি: নারী শিক্ষার্থীদের সাইবার বুলিং ও বিভিন্ন ধরনের হয়রানি থেকে সুরক্ষা দেওয়া আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এ জন্য একটি সেল গঠন করা হয়েছে। সেলের নির্দিষ্ট কার্যালয় রয়েছে এবং একটি কমিটি কাজ করছে।
চাকসুর আইন সম্পাদক এ বিষয়ে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। নারী শিক্ষার্থীরা যখন আইনি সহযোগিতা বা পরামর্শ চেয়েছেন, তিনি তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাইবার সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিটের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে এবং কয়েকটি ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
সাইবার হামলা, বুলিং ও হয়রানি থেকে নারী শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেছি।
বার্তা২৪: সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চাকসুর দূরত্ব কমাতে কী করেছেন? তারা কি সহজে নিজেদের সমস্যার কথা জানাতে পেরেছেন?
ইব্রাহিম রনি: শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। চাকসুর অধিকাংশ প্রতিনিধি নিয়মিত কার্যালয়ে বসেছেন। আমাদের ফোন নম্বর, ওয়েবসাইট ও বিভিন্ন যোগাযোগের তথ্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল, যাতে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
শিক্ষার্থীরা ফোন করেছেন, কার্যালয়ে এসেছেন, নিজেদের অভিযোগ জানিয়েছেন। আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে তাঁদের সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগও নিয়েছি।
আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে আবার নির্বাচন হলে আমাদের প্যানেলের অনেকেই শিক্ষার্থীদের সমর্থন পাবেন।
বার্তা২৪: দায়িত্ব পালনকালে সবচেয়ে বেশি কোন বিষয় নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে?
ইব্রাহিম রনি: চাকসু নির্বাচনে অনেক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অল্পসংখ্যক নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পেয়েছেন, বাকিরা নির্বাচিত হননি। তারপরও যাঁরা নির্বাচিত হননি, তাঁদের অনেকেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন।
ভিপি পদেই প্রায় ২৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। একজন নির্বাচিত হওয়ার পর অন্যদের পক্ষ থেকে তার বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা এমন কোনো ভুল করিনি, যা নিয়ে শিক্ষার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কিংবা রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনগুলো বড় ধরনের অভিযোগ তুলতে পেরেছে বলে আমি মনে করি না।
দুই-চারটি বিষয়ে সমালোচনা হয়েছে। তবে আমরা নিজেদের মতো করে কাজ করে গেছি এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছি।
বার্তা২৪: আপনাদের প্যানেলের কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ উঠলে কী জবাব দেবেন?
ইব্রাহিম রনি: আমরা একটি ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে প্যানেল নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম এবং সেই প্যানেল নির্বাচিত হয়েছে। কেউ যদি মনে করেন, আমরা কোনো ছাত্রসংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করেছি, তাহলে তারা নির্দিষ্ট অভিযোগ উপস্থাপন করতে পারেন। আমরা তার ব্যাখ্যা দিতে প্রস্তুত।
আমরা কোনো ছাত্রসংগঠনের জন্য চাকসুর কাজ পরিচালনা করিনি। ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের নিজস্ব কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। আর আমরা চাকসুর বাজেট, নিজেদের ক্ষমতা, স্পনসর এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেছি।
শিক্ষার্থীদের পক্ষে আন্দোলন-সংগ্রামে থাকার প্রয়োজন হলে আমরা রাজপথে থেকেছি। চাকসুর প্ল্যাটফর্ম থেকে কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করিনি।
বার্তা২৪: চাকসুর প্রতিনিধিদের মধ্যে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কখনো মতবিরোধ হয়েছে? হলে কীভাবে সমাধান করেছেন?
ইব্রাহিম রনি: চাকসু একটি বড় প্ল্যাটফর্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে আমাদের কাজ করতে হয়েছে। প্রশাসনের কারও কারও সঙ্গে মতের অমিল হয়েছে, কিন্তু সেটিকে আমরা দ্বন্দ্বে পরিণত করিনি।
আমরা নিজেদের মতামত তুলে ধরেছি, প্রশাসনও তাদের মতামত জানিয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে দুই পক্ষের মধ্যে ভারসাম্য রেখে শিক্ষার্থীদের জন্য যা সঠিক, তা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেসব ক্ষেত্রে আমরা অংশগ্রহণ করিনি। শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান রাখার চেষ্টা করেছি।
বার্তা২৪: চাকসুর মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় কোন কাজগুলো অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে বলে মনে করেন?
ইব্রাহিম রনি: ছাত্রীদের জন্য ১০ তলা হল নির্মাণ আমাদের বড় এজেন্ডাগুলোর একটি ছিল। হলটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হতে পারলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রস্তাব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে আমরা জানি। আশা করছি, দ্রুত কাজ এগোবে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়া, বারবার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং ছাত্রীদের দাবির পক্ষে কাজ করার মাধ্যমে আমরা প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমাদের ইচ্ছা ছিল, হলটির নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক সূচনা দেখে যেতে পারব।
আরেকটি বিষয় হলো, টিএসসি নির্মাণ। এর প্রক্রিয়া এগিয়েছে। দ্রুত এটি বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করছি। কিন্তু দায়িত্বে থাকতে উদ্বোধন দেখে যেতে পারব কি না, তা নিশ্চিত নই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও আমাদের প্রত্যাশা ছিল। এ নিয়ে আমরা কাজ করেছি। পাশাপাশি পরিবহন সমস্যা সমাধানে শাটল ট্রেনের দ্বিতীয় লাইন চালুর বিষয়ে জরিপের কাজ শুরু হয়েছে। এসব কাজের সুফল হয়তো আমরা দায়িত্বে থাকতে দেখে যেতে পারব না। পরবর্তী শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাবেন বলে আশা করি।
বার্তা২৪: পরবর্তী চাকসুর প্রতিনিধিদের জন্য আপনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কি?
ইব্রাহিম রনি: প্রথমত, দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের কাজ ও দায়িত্বের পরিধি ভালোভাবে বুঝতে হবে। নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রতিদিন কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে চাকসুর স্বতন্ত্র পরিচয় বিসর্জন দেওয়া যাবে না। চাকসুকে কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনে পরিণত করা উচিত নয়।
তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংগঠন, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তর, এমনকি রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষও যদি কখনো চাকসুর বিপরীতে অবস্থান নেয়, অথচ চাকসু শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের লড়াই বন্ধ করা যাবে না।
বার্তা২৪: দায়িত্ব ছাড়ার পরও কি শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করবেন?
ইব্রাহিম রনি: স্বাভাবিকভাবেই আমার নামের সঙ্গে চাকসুর ভিপি পরিচয় যুক্ত হয়েছে। এ জায়গা থেকে আমার দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমি মনে করি, আমার শপথ শুধু এক বছরের জন্য নয়; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার এই শপথ শত বছরের।
আমি যত দিন বেঁচে থাকব, যেখানেই থাকি না কেন, শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করে যাব। প্রয়োজনে প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবেও তাদের পাশে থাকব।
বার্তা২৪: দায়িত্ব ছাড়ার আগে নিজের অবস্থান থেকে কোন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে চান?
ইব্রাহিম রনি: আমি তিনটি চ্যালেঞ্জ দিতে চাই।
প্রথমত, চাকসুর ভিপি হিসেবে আমি কারও জন্য হলের আসন বরাদ্দের সুপারিশ করিনি।
দ্বিতীয়ত, কাউকে চাকরি দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে বলিনি কিংবা চাকরির সুযোগ তৈরি করে দিইনি।
তৃতীয়ত, আমি কোনো আর্থিক অনিয়ম বা অর্থের খেয়ানত করিনি। কেউ যদি এর প্রমাণ দিতে পারেন, তাহলে আমি চাকসুর ভিপি পদ থেকে পদত্যাগ করব।
বার্তা২৪: এক বাক্যে বলুন, চাকসুর ভিপি হিসেবে আপনি সফল, নাকি ব্যর্থ?
ইব্রাহিম রনি: আমি সফল নাকি ব্যর্থ, সেই হিসাব দেবেন আমাদের শিক্ষার্থী ভাই-বোনেরা।
বার্তা২৪: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে কোনটি পূরণ করতে পারেননি এবং কেন?
ইব্রাহিম রনি: নির্বাচনী ইশতেহারে ক্যাম্পাসের ভেতরে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বা অন-ক্যাম্পাস জব চালুর প্রতিশ্রুতি ছিল। এ বিষয়ে আমরা ছয়-সাতটি প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসন সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
বার্তা২৪: দায়িত্ব শেষে শিক্ষার্থীরা আপনাকে কী কারণে মনে রাখবেন বলে আশা করেন?
ইব্রাহিম রনি: ইনশাআল্লাহ, শিক্ষার্থীরা আমাকে মনে রাখবেন, কারণ আমি একটি বছর তাঁদের সঙ্গে ছিলাম এবং তাঁদের দাবি-দাওয়ার পক্ষে লড়াই-সংগ্রাম করেছি। প্রত্যেক মানুষের সামর্থ্যের একটি সীমা থাকে। আমার সামর্থ্যের মধ্যে থেকে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি।
শিক্ষার্থীদের যেখানে সহযোগিতা প্রয়োজন হয়েছে, সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। তারা যেন গর্ব করে বলতে পারেন, তাঁদের চাকসুর সঙ্গে অন্যায়, অপরাধ কিংবা দুর্নীতির কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না—এটাই আমার প্রত্যাশা।
বার্তা২৪: ভবিষ্যতে কোথায় নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে?
ইব্রাহিম রনি: আমরা ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। সংগঠনের প্রয়োজন অনুযায়ী যাঁকে যেখানে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তিনি সেখানে নির্বাচনে অংশ নেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কোথাও নির্বাচন করব—এমন কোনো চাওয়া বা পরিকল্পনা এখন নেই। সংগঠন যে সিদ্ধান্ত নেবে, ইনশাআল্লাহ সেটিই অনুসরণ করব।
বার্তা২৪: চাকসুর কার্যক্রম ও ব্যয়ের হিসাব শিক্ষার্থীদের সামনে প্রকাশ করার উদ্যোগ আছে কি?
ইব্রাহিম রনি: চাকসু যত টাকা ব্যয় করেছে, তার হিসাব অবশ্যই উপস্থাপন করবে। আমরা শেষ পর্যন্ত একটি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে চাকসুর সার্বিক কার্যক্রম ও ব্যয়ের হিসাব সবার সামনে প্রকাশ করব।
