তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও ৬ বছরেও শেষ হয়নি রাজবাড়ী, মাগুরা ও ঝিনাইদহ তিন জেলার সীমান্তবর্তী পাংশা উপজেলার নাদুরিয়া এলাকায় গড়াই নদীর ওপর ৬৫০ মিটার দীর্ঘ পিএসসি গার্ডার সেতুর নির্মাণকাজ। এতে রাজবাড়ীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৭টি জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত যোগাযোগব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের স্বপ্ন থমকে আছে। যাত্রীদের যাতায়াতে ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার পথ কমানোসহ সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের যে বিপুল সম্ভাবনা ছিল, কাজের চরম ধীরগতিতে তা এখন এলাকাবাসীর জন্য গভীর হতাশায় রূপ নিয়েছে।
রাজবাড়ী এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ (সিআইবিআরআর) প্রকল্পের আওতায় ৬৩ কোটি ৯১ লাখ ৬৮ হাজার ১৭০ টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালের ৩ জুন সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর হাবিবুল আলম (জেভি)-এর এমএম বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩ জুন কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে দুই দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই বর্ধিত সময়েও কাজ শেষ করতে না পারায় সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর তৃতীয় দফার সময়সীমা শেষ হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭৫ শতাংশ। ৩ দফা মেয়াদ বাড়িয়েও দীর্ঘ ৬ বছরে কাজটি সম্পন্ন করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি নির্মাণ এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ৬৫০ মিটার সেতুর চারটি স্প্যান ও দুটি গার্ডার বসানো এখনও বাকি রয়ে গেছে। কাজের জায়গায় রাজবাড়ী প্রান্তে মাত্র তিন-চারজন শ্রমিক অলস ভঙ্গিতে কাজ করছেন। মালামাল সরবরাহের অভাব এবং চরম শ্রমিকসংকটের কারণে কাজের গতি একদম কমে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকরা জানান, চরম অনিয়মের কারণে কাজের এই ধীরগতি। নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক পিকুল হোসেন জানান, নিয়মিত মজুরি না পাওয়ায় ১৫ জন শ্রমিকের মধ্যে ১২ জনই কাজ ছেড়ে চলে গেছেন। গত চার মাস ধরে তারাও কোনো মজুরি পাননি। এ ছাড়া সেতুর উভয় পাশে সংযোগ (অ্যাপ্রোচ) সড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ না করায় কাজ থমকে আছে। ফলে ঝুঁকি নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় যাত্রী ও যানবাহন পারাপার করতে হচ্ছে। নাদুরিয়া গ্রামের শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহ জানায়, প্রতিদিন নৌকায় নদী পার হয়ে মাগুরার লাঙ্গলবাঁধ উচ্চ বিদ্যালয়ে যেতে হয় তাকে। সেতুটি দ্রুত চালু হবে ভেবে সেখানে ভর্তি হলেও স্কুলজীবন শেষ হতে চলল কিন্তু সেতুর কাজ শেষ হলো না। বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন, পারাপারের সমস্যার কারণে রাজবাড়ীর প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে আসতে পারে না।
এলাকাবাসীর মতে, রাজবাড়ী, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, নড়াইল, যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার মানুষের চলাচলে এ সেতুটি অত্যন্ত জরুরি। এটি চালু হলে আন্তঃজেলা যোগাযোগের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে অপার সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। বিশেষ করে রাজবাড়ীর কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পচনশীল পণ্য সহজে খুলনা ও মাগুরাসহ অন্যান্য জেলায় পৌঁছে ভালো দাম পাবেন।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আবদুল হামিদ বলেন, সেতুর কাজ পুরোপুরি শেষ করতে আরও অন্তত এক বছর সময় লাগবে এবং সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে। রাজবাড়ী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান বলেন, সংযোগ সড়কের জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজের গতি কিছুটা থমকে ছিল। তবে বর্তমানে জমি অধিগ্রহণের সরকারি অনুমোদন পাওয়া গেছে। সংযোগ সড়কের কাজ পুরোদমে শুরু হবে এবং খুব দ্রুততম সময়ে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করে জনদুর্ভোগ লাঘব করা সম্ভব হবে।
