মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির আদিম গল্প। চট্টগ্রামের রাজাপুকুর লেনের ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ সেই গল্পকেই শিল্পের ভাষায় তুলে ধরে, যেখানে মাটির স্পর্শে মৃন্ময়ী দুর্গা হয়ে ওঠেন চিন্ময়ী।
মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির আদিম গল্প। সেই মাটি শিল্পীর হাতে প্রাণ পায় দেবীর প্রতিমা। চট্টগ্রামের রাজাপুকুর লেনের ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ তাই শুধু পূজামণ্ডপের শিল্পনির্মাণ নয়, মাটির সঙ্গে মানুষের শিকড়, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্বের এক নিবিড় আত্মকথন।

মাটি। আপাতদৃষ্টিতে নিস্তরঙ্গ, নিরাভরণ এক উপাদান। অথচ তার বুকেই জমা থাকে জীবনের অসংখ্য উপাখ্যান। বীজ থেকে বৃক্ষ, শূন্যতা থেকে বসতি, কল্পনা থেকে শিল্প—সৃষ্টির প্রতিটি পর্বে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সেই মাটিকে হাতের স্পর্শে রূপ দেওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে শিল্পীর সাধনা। আর যখন সেই মাটির অবয়বে আবির্ভূত হন দেবী দুর্গা, তখন সৃষ্টি ও বিশ্বাস মিলেমিশে তৈরি করে এক অপার্থিব অনুভব।
চট্টগ্রামের রাজাপুকুর লেনের শারদীয় দুর্গোৎসবে এ বছর সেই চিরন্তন সম্পর্কই নতুন করে অনুভব করার আহ্বান জানাচ্ছে ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’।
মৃন্ময় থেকে চিন্ময়ী
মাটির তৈরি প্রতিমা মৃন্ময়ী। কিন্তু ভক্তের আরাধনা, বিশ্বাস ও অনুভবের মধ্য দিয়ে সেই মৃন্ময়ী রূপই হয়ে ওঠে চিন্ময়ী। এই রূপান্তরের দর্শনকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এবারের মণ্ডপভাবনা।

রুক্ষ হাতে নরম মাটি তুলে নেন শিল্পী। আঙুলের চাপে, পরিমিত টানে, কখনো আলতো স্পর্শে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে একটি অবয়ব। কুমোরের চাকা ঘোরে। মাটির পিণ্ডে জন্ম নেয় রূপ। অনড় উপাদানের মধ্যে সঞ্চারিত হয় প্রাণের ইশারা। প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি রেখা, প্রতিটি স্পর্শ যেন বলে যায় সৃষ্টির নিজস্ব গল্প।
এই নির্মাণপ্রক্রিয়া নিছক কারিগরি দক্ষতার পরিচয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রম, ধৈর্য, কল্পনা ও উত্তরাধিকারের দীর্ঘ ইতিহাস। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান মৃৎশিল্পের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিল্পীর হাতে নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাটির সঙ্গে তাঁর এই নিবিড় সংলাপেই তৈরি হয় দেবীর রূপ, যা পরবর্তী সময়ে অসংখ্য মানুষের আবেগ ও আরাধনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ সেই শিল্পসাধনাকেই সামনে নিয়ে আসে। দর্শনার্থীকে শুধু প্রতিমা দেখার নয়, প্রতিমা সৃষ্টির পেছনের দর্শন উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়।
মাটির মধ্যে শিকড়ের সন্ধান
মানুষের পরিচয় কি কেবল তার নাম, ঠিকানা কিংবা সামাজিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ? নাকি তার গভীরে থাকে আরও প্রাচীন কোনো সম্পর্ক—জন্মভূমির সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে, পূর্বপুরুষের সঙ্গে?

মাটি সেই সম্পর্কেরই এক মৌলিক প্রতীক। যে মাটিতে মানুষের জন্ম, যে মাটির ফসল তার জীবন ধারণ করে, যে মাটির উপাদান দিয়ে গড়ে ওঠে তার ঘরবাড়ি, শিল্প ও উপাসনার প্রতীক—সেই মাটিই তার অস্তিত্বের ভিত্তি। বাংলার গ্রামীণ জীবনে মৃৎশিল্প, কুমোরপাড়া, মাটির পাত্র ও প্রতিমা নির্মাণ তাই কেবল উৎপাদনব্যবস্থার অংশ নয়; এগুলো লোকজসংস্কৃতি ও জীবনযাপনেরও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
দুর্গাপূজার প্রতিমা নির্মাণে এই সম্পর্ক আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণ মাটি শিল্পীর হাতে রূপ পায়, আর সেই রূপের মধ্যে ভক্ত খুঁজে পান দেবীর উপস্থিতি। বস্তু থেকে ভাব, অবয়ব থেকে অনুভব, মৃন্ময় থেকে চিন্ময়ী—এই যাত্রাই পূজার অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য।
রাজাপুকুর লেনের এবারের ভাবনায় মাটির এই বহুমাত্রিক তাৎপর্য যেন নতুন ভাষা পেয়েছে। এখানে মাটি কেবল প্রতিমা গড়ার উপকরণ নয়, বরং আমাদের শিকড়, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ধারক।
কুমোরের আঙুলে জেগে ওঠে সৃষ্টির গল্প
একটি প্রতিমা যখন পূজামণ্ডপে পূর্ণতা নিয়ে দাঁড়ায়, তখন তার পেছনের দীর্ঘ শ্রম অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। অথচ সেই রূপের জন্মের মুহূর্তগুলোতে থাকে এক অসাধারণ নাটকীয়তা।
প্রথমে কাঠামো। তারপর খড়ের বাঁধন। ধাপে ধাপে মাটির প্রলেপ। শুকিয়ে যাওয়া, আবার মসৃণ করা। মুখাবয়বের সূক্ষ্ম নির্মাণ, চোখ আঁকার নিবিড় মনোযোগ, রং ও অলংকরণের পরিমিত ব্যবহার—প্রতিটি পর্যায়ে শিল্পীকে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সামান্য একটি রেখাও বদলে দিতে পারে মুখের অভিব্যক্তি; একটি স্পর্শে ফুটে উঠতে পারে মমতা, দৃঢ়তা কিংবা মহাশক্তির দীপ্তি।

কুমোরের কাদামাখা আঙুলে তাই শুধু মাটির রূপান্তর ঘটে না, দৃশ্যমান হয়ে ওঠে মানুষের সৃজনশীলতার শক্তি।
‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ ভাবনাটিকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মণ্ডপের শিল্পনির্মাণের সঙ্গে যুক্ত হয় শিল্পীর শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা। দেবীর প্রতিমা আমাদের কাছে পূজার কেন্দ্র, কিন্তু সেই প্রতিমার রূপকারও আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর হাতের কাজেই শতাব্দীপ্রাচীন শিল্পজ্ঞান নতুন সময়ে প্রবেশ করে।
ঝড়ের মধ্যেও প্রাণের সন্ধান
জীবন সব সময় মসৃণ পথে এগোয় না। সংকট আসে, বিপর্যয় আসে, ভেঙে পড়ে পরিচিত কাঠামো। তবু মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে আবার গড়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা। ধ্বংসের মধ্যেও নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়ার এই শক্তিই মানবজীবনের অন্যতম বড় আশ্রয়।
মাটি সেই আশ্রয়ের প্রতীক হতে পারে। তাকে ভাঙা যায়, তার রূপ বদলে যায়; কিন্তু সেই মাটিতেই আবার জন্ম নেয় নতুন জীবন। মাটির বুকেই শিকড় ছড়ায় গাছ, অঙ্কুরিত হয় বীজ। প্রকৃতির এই চিরন্তন চক্র আমাদের শেখায়—সৃষ্টি কখনো থেমে থাকে না।

দেবী দুর্গার আরাধনাতেও আমরা শক্তি, সাহস, মমতা এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের জয় কামনা করি। তাই মাটির অবয়বে দেবীর প্রকাশ কেবল ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুষঙ্গ নয়; তা মানুষের অন্তর্গত শক্তি ও পুনর্জাগরণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও যুক্ত।
‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ সেই উপলব্ধিরই এক শিল্পিত পাঠ—যেখানে মাটির নীরবতা থেকে উঠে আসে প্রাণের ভাষা, আর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয় মহাশক্তির ধারণা।
ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন সময়ের সংলাপ
চট্টগ্রামের দুর্গাপূজায় বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপনির্মাণের একটি সমৃদ্ধ ধারা রয়েছে। রাজাপুকুর লেনও সেই ধারার পরিচিত একটি নাম। চেরাগী পাহাড়সংলগ্ন এই এলাকার রাজাপুকুর লেন-মোমিন রোড-জামালখান পূজা উদ্যাপন পরিষদ তাদের আয়োজনে প্রতিমা ও মণ্ডপের উপস্থাপনায় নতুনত্ব আনার চেষ্টা করে আসছে।
এবারের ‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ সেই সৃজনশীল ধারায় যুক্ত করেছে মাটিকেন্দ্রিক এক ভাবনাকে। এর বিশেষত্ব শুধু একটি নান্দনিক মণ্ডপ নির্মাণে নয়, বরং পরিচিত একটি উপাদানকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ করে দেওয়ায়।

আমরা প্রতিদিন মাটির ওপর দিয়ে হাঁটি, মাটিতে ঘর বাঁধি, মাটির ফসল খেয়ে বেঁচে থাকি। অথচ সেই মাটির মধ্যেই যে কত ইতিহাস, কত শিল্প, কত বিশ্বাস ও কত জীবনসংগ্রাম লুকিয়ে আছে, তা সব সময় অনুভব করি না। শিল্পের কাজই হয়তো আমাদের সেই বিস্মৃত উপলব্ধির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
এই মণ্ডপভাবনা তাই একই সঙ্গে নান্দনিক ও সাংস্কৃতিক। একদিকে রয়েছে মৃৎশিল্পের কারুকাজ, অন্যদিকে মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দার্শনিক ব্যাখ্যা। একটি পূজামণ্ডপ যখন এমন ভাবনার বাহক হয়, তখন তা উৎসবের সাময়িক সৌন্দর্য ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে ভাবনারও পরিসর।
মাটিতেই সৃষ্টি, মাটিতেই প্রত্যাবর্তন
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দে মানুষ যখন মণ্ডপে সমবেত হয়, তখন প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকে হয়তো নিজের মতো করে খুঁজে নেয় দেবীর অর্থ। কারও কাছে তিনি শক্তি, কারও কাছে আশ্রয়, কারও কাছে মাতৃরূপ, আবার কারও কাছে অশুভের বিরুদ্ধে শুভের চিরন্তন প্রত্যয়।
‘মৃত্তিকায় চিন্ময়ী’ এই বহুমাত্রিক অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় মাটির দর্শনকে। মনে করিয়ে দেয়, আমাদের অস্তিত্বের গভীরে রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে এক আদিম বন্ধন। সেই বন্ধনের মধ্যেই আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের বীজ।

মাটির বুক চিরে জন্ম নেয় যে জীবন, সেই জীবনেই মিশে থাকে মানুষের স্বপ্ন। শিল্পীর হাতে মাটি যখন প্রতিমা হয়ে ওঠে, তখন সেই স্বপ্ন দৃশ্যমান রূপ পায়। আর ভক্তির স্পর্শে মৃন্ময়ী দুর্গা হয়ে ওঠেন চিন্ময়ী—শক্তি, শুভবোধ ও মমতার চিরন্তন প্রতীক।
শেষ পর্যন্ত মাটি শুধু আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি নয়; মাটি আমাদের শিকড়, আমাদের পরিচয়, আমাদের সংস্কৃতির ধারক। সৃষ্টির শুরু থেকে জীবনের প্রতিটি বাঁকে তার উপস্থিতি অবিচ্ছেদ্য।
মাটিতেই সৃষ্টি, মাটিতেই শিকড়। আর সেই মাটির বুকেই চিন্ময়ী দুর্গা মায়ের চিরন্তন প্রকাশ।
ছবি: লেখক
