জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মো. তরিকুল ইসলাম এটিকে একটি ‘টার্গেট কিলিং' হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷
তিনি জানান, আলিফ ফকির দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছিলেন৷ ধারণা করা হচ্ছে, তাদেরই কোনো একটি গ্রুপ এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত৷ অপরাধীদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে পুলিশ৷
চা দোকানে ঢুকে পর পর ৬টি গুলি
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া আটটার দিকে নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া বাজারে একটি চায়ের দোকান থেকে চা খেয়ে বের হচ্ছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ৷ এ সময় হঠাৎ দুই যুবক এসে তাকে লক্ষ্য করে পর পর কয়েকটি গুলি ছোড়ে৷ গুলির শব্দ শুনে স্থানীয়রা ছুটে এলে যুবকেরা কিছুটা দূরে রাখা একটি মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়৷ পরে লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন৷
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডের আলামত হিসেবে ছয়টি গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে৷ নিহতের ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির জানান, আলিফের বুকে ও শরীরের সামনের অংশে মোট ছয়টি গুলি লেগেছে৷
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা'র নেত্রকোণা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন৷ পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল' নামের একটি ফেসবুক পেজ চালাতেন, যেখানে এই অঞ্চলের মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভিডিও এবং প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন৷
হুমকির মুখেও থামেনি সাংবাদিকতা, চেয়েছিলেন নিরাপত্তা
স্থানীয় সাংবাদিক আকাশ আহমেদ জানান, ‘‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল নামের ফেসবুক পেজটির কারণেই অপরাধীরা তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল৷ তিনি যাদের বিরুদ্ধে ওই পেজে প্রতিবেদন করতেন, ভিডিও করতেন তারা প্রভাবশালী৷ এই অঞ্চলে চোরাকারবারীরা অনেক পাওয়ার ফুল৷ তিনি এইসব অপরাধের নেপথ্যের গডফাদারদের তালিকাও প্রকাশের ঘোষণা দিয়েছিলেন তার ফেসবুক পেজে৷''
নেত্রকোণার এসপি মো. তরিকুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডের মাত্র চার-পাঁচ দিন আগে আলিফ ফকির তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন৷ সেই সময় তিনি (আলিফ ফকির) তার ফেসবুক পেজের কাজগুলো তাকে দেখান এবং নিজের নিরাপত্তার ব্যাপারে শঙ্কা প্রকাশ করেন বলে জানান এসপি৷ ‘‘আমি তাকে অভয় দিয়ে তার সাংবাদিকতা চালিয়ে যেতে বলেছিলাম৷ বলেছিলাম কোনো সমস্যা নাই৷ আমার খুব খারাপ লাগছে যে তাকে হত্যা করা হলো,'' ডয়চে ভেলেকে বলেন পুলিশের এই কর্মকর্তা৷
এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীতে রিপোর্টিংয়ের সময় আলিফকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছিল৷ দীর্ঘদিন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসার পর তিনি সুস্থ হন৷ চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও তার ওপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছিল৷
আসামিরা জামিনে থাকায় ক্ষোভ, বিচারের দাবি পরিবারের
নিহতের ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির ও শ্যালক জিয়ন সাংমা অভিযোগ করেন, গত বছরের হামলার ঘটনায় মামলা করা হলেও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি৷ পুলিশ চার্জশিট দিলেও যে কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছিল, তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়৷ আগের হামলার ঘটনায় সঠিক ব্যবস্থা নিলে আজ এই হত্যাকাণ্ড ঘটতো না বলে মনে করেন তারা৷

নিহতের ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির বলেন, ‘‘আমার ভাইয়ের ওপর এর আগেও হামলা হয়েছে৷ গত বছরের নভেম্বরের ১০ তারিখ সোমেশ্বরী নদীতে সে যখন নৌকায় করে রিপোর্টিং-এর কাজ করছিল তখন তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়৷ দীর্ঘদিন ঢাকার পঙ্গু হাসাপাতালে চিকিৎসা নেয়ার পর সে সুস্থ হয়৷ তার বা হাতে কোপ দেয়া হয়েছিল৷'' তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘ওই সময় মামলা করা হলেও মূল আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়নি৷ যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয় তারাও জামিনে ছাড়া পেয়েছে৷''
শহিদুল ইসলাম ফকির মনে করেন, ‘‘ওই হামলার ধারাবাহিকতায় তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে৷ আমার ভাই সব সময় চোরাচালানি, মাদক কারবারী ও অপরাধের গডফাদারদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল৷ সে তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করত৷ তার কারণেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে৷''
শ্যালক জিয়ন সাংমা বলেন, ‘‘তাকে তার লেখালেখির কারণেই হত্যা করা হয়েছে৷ এর আগেও তার ওপর আক্রমণ হয়৷ তখন ঠিকমতো ব্যবস্থা নিলে হয়তো এই ঘটনা ঘটতো না৷''
নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী অনিন্দিতা সাংমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘‘আমি আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই৷ কারা হত্যা করেছে তা সবাই জানে৷''
সাংবাদিক ও মানবাধিকার নেতাদের উদ্বেগ
এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, ‘‘আগে হামলার শিকার হওয়ার পরও যদি পুলিশ তাকে নিরাপত্তা দিত, তাহলে হয়তো এই হত্যাকাণ্ড ঘটতো না৷ সাংবাদিকরা এখন মাদক ব্যবসায়ী, চোরাকারবারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন পক্ষের টার্গেটে পরিণত হচ্ছে৷ আমরা সরকারের কাছে দ্রুত ‘সাংবাদিক সুরক্ষা আইন' চালুর দাবি জানাচ্ছি৷''
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাজিয়া কবীর এই ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন৷ তিনি বলেন, ‘‘রিপোর্ট করার কারণে সাংবাদিকদের যদি এভাবে হত্যা করা হয়, তবে সাংবাদিকতা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে৷ সরকারের উচিত সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা৷'' আসক-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই ২১৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, মামলা ও হুমকির শিকার হয়েছেন৷ হত্যার শিকার হয়েছেন একজন৷ গত ৫ জানুয়ারি যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগী নামে আরো এক সাংবাদিককে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয়৷
পুলিশ জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে৷ এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি৷
