কাঁচাবাজারে সবজিসহ নিত্যপণ্যের চড়া দামে সাধারণ ভোক্তাদের নাভিশ্বাস ওঠার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজি, পথিমধ্যে চাঁদাবাজি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ত্রুটি প্রধানত দায়ী। কৃষক পর্যায় থেকে সবজি বা অন্যান্য কৃষি পণ্য যখন পাইকারি ও খুচরা বাজারে এসে পৌঁছায়, তখন হাতবদলের কারণে দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে পণ্যবাহী ট্রাক আসার পথে বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, যা পণ্যের দাম বাড়ানোর অন্যতম অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন ব্যবসায়ীরা। শক্তিশালী বিপণন ব্যবস্থা ও তদারকির অভাবে ফরোয়ার্ড মার্কেট বা আড়তদারদের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। রাজধানীর পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বিক্রেতার হাতে পৌঁছাতেই লাফিয়ে বাড়ছে সবজির দাম। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, আড়ত ভাড়া এবং হাতবদলের কারণে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এই দাম কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের এমন চড়া দামের চাপে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতাদের। রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘরে দেখা যায়, প্রতি কেজি পাকা ও কাঁচা টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। মানভেদে দেশি গাজর ১০০ টাকা এবং চায়না গাজর ১৬০ টাকা কেজি দরে মিলছে। বেগুনের ক্ষেত্রে লম্বা বেগুন ৮০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা এবং কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া শীতের আগাম শিম ১২০ থেকে ১৬০ টাকা এবং দেশি শসা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়।
অন্যান্য সাধারণ সবজির মধ্যে উচ্ছে, করলা, কাঁকরোল, ঢেঁড়স, ঝিঙে, বরবটি, কচুর লতি ও কচুরমুখী বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ টাকায়। এছাড়া চিচিঙ্গা ও ধুন্দুল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, মূলা ৬০ টাকা, হাইব্রিড পটল ও হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা এবং পেঁপে ৩০ থেকে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে এক হাত বদলেই কেজিপ্রতি সবজির দাম বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারচেয়েও বেশি।
কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং ধনেপাতা ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। পিস হিসাবে আকার ও মানভেদে প্রতিটি লাউ ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং চালকুমড়া, ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া প্রতি হালি কাঁচা কলা ও লেবুর দাম হাঁকা হচ্ছে ৫০ টাকা।
এদিকে পাইকারি ও খুচরা বাজারের মধ্যে দামের বড় ফারাক দেখা গেছে। পাইকারি বাজারে যে লাউ ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়, খুচরা বাজারে সেই একই লাউ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে ৪০ থেকে ৫০ টাকা। একইভাবে পাইকারিতে ২৫ টাকার ঢেঁড়স খুচরায় ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং ৩২ টাকার ফুলকপি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মূলত পাইকারি থেকে খুচরা বাজারে পৌঁছাতে এক হাত বদলেই কেজিপ্রতি সবজির দাম বাড়ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারচেয়েও বেশি।
রাজধানীর সাদেক খান পাইকারি আড়তে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, রাজশাহী ও পাবনাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শাক-সবজি আসছে। সেখান থেকে ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতারা পণ্য কিনে নিয়ে যান। বাজারটিতে শস্যজাতীয় সবজির পাশাপাশি শাকও পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে, যেখানে প্রতি আঁটি কলমিশাক ৩ টাকা, লালশাক ৬ টাকা, পাটশাক ৭ টাকা, মূলাশাক ১০ টাকা এবং পুঁইশাক ২৫ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া কেজি হিসাবে ঢেঁড়স ২৫ টাকা এবং প্রতি পিস হিসেবে ফুলকপি ৩২ থেকে ৩৫ টাকা ও লাউ ১২ থেকে ১৫ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হতে দেখা যায়।
আড়তে সীমিত কমিশন রাখা হয়। সব টাকা তো পরিবহনে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি কয়েক রকম টোল দিয়ে আসতে হয়। আগে যে গাড়ি ১৫ হাজার দিয়ে আসত, এখন সেই ২০ হাজার দিয়ে আসতেও কষ্ট হয়। কৃষক সবজির দাম কম পায় এটা ঠিক, কিন্তু পরিবহন ভাড়াও সবজির ভেতরে যুক্ত হয়। আর সবজিতে মধ্যস্বত্বভোগী বেশি। কৃষক থেকে স্থানীয় পাইকার, তারপর ঢাকার পাইকার, সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতা, তারপর ক্রেতা। কয়েক হাত বদলের কারণেও দাম বেড়ে যায়।
পাইকারি এ আড়তে পাল্লা হিসেবে (৫ কেজি) পেঁপে ৪০ টাকা, উচ্ছে ১৫০ টাকা, বরবটি ১৮০ টাকা, ধুন্দুল ২২০ টাকা, চিচিঙ্গা ও কাঁকরোল ২৫০ টাকা, বেগুন ৩০০ টাকা, কাঁচা মরিচ ৩২০ টাকা এবং শিম ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাদেক খান আড়তের মেসার্স তারানগর বাণিজ্যালয়ের বিক্রেতা মো. আরিফ বলেন, কাঁচামালের দাম বাড়ে-কমে। আজ আড়তে বেগুনের পাল্লা (৫ কেজি) ৩০০ টাকা, চিচিঙ্গা ২৫০ টাকা, কাঁকরোল ২৫০ টাকা, ধুন্দুল ২২০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। আড়তের কমিশন ও শ্রমিকের মজুরি ৩ টাকা থেকে ৪ শতাংশ খরচ হয়। খুচরা বিক্রেতারা চাইলে আরো কমে বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু তারা ১৫০০ টাকা পুঁজি দিয়ে ১০ ঘণ্টায় ১০০০ টাকা কামাতে চায়।
আরেক আড়তদার বলেন, আড়তে সীমিত কমিশন রাখা হয়। সব টাকা তো পরিবহনে চলে যায়। প্রতিটি গাড়ি কয়েক রকম টোল দিয়ে আসতে হয়। আগে যে গাড়ি ১৫ হাজার দিয়ে আসত, এখন সেই ২০ হাজার দিয়ে আসতেও কষ্ট হয়। কৃষক সবজির দাম কম পায় এটা ঠিক, কিন্তু পরিবহন ভাড়াও সবজির ভেতরে যুক্ত হয়। আর সবজিতে মধ্যস্বত্বভোগী বেশি। কৃষক থেকে স্থানীয় পাইকার, তারপর ঢাকার পাইকার, সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতা, তারপর ক্রেতা। কয়েক হাত বদলের কারণেও দাম বেড়ে যায়।
বাবুল এন্টারপ্রাইজের এক আড়তদার বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব অবশ্যই সবজি বাজারে পড়েছে। আগে যেখানে গাড়িভাড়া ১৮-২০ হাজার টাকা ছিল, সেখানে তা ৩-৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বগুড়া থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে আগে গাড়িভাড়া ছিল ১৫ হাজার টাকা। এখন তা ১৮-১৯ হাজার টাকা হয়েছে। তবে এ ব্যয় বৃদ্ধির মাত্রা দূরত্বভেদে ভিন্ন ভিন্ন। সব মিলিয়ে পরিবহন ব্যয় আনুমানিক ২৫-৩০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি মাসে সবজির দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে পরিবহন ব্যয়েরও বড় ভূমিকা আছে।
রায়েরবাজারে সবজির খুচরা বিক্রেতা রমজান আলী বলেন, পাইকারি বাজার থেকে যে দামে সবজি কিনতে হয়, খুচরা বাজারে সেই দাম ও খরচ হিসাব করেই বিক্রি করতে হয়। আজ এক পাল্লা টমেটো কিনেছি ৫০০ টাকায়। সেই টমেটো খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছি। কাঁচা মরিচ বিক্রি করছি ১৪০ টাকা কেজি দরে। আকার ও মানভেদে লাউয়ের দাম পড়ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা। শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখনো বাজারে পর্যাপ্ত না থাকায় দাম তুলনামূলক বেশি। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হলে খুচরা বাজারেও তার প্রভাব পড়ে।
বিআলো/অর্নব