২০১৮ সালের দিকে দোকানে ওয়ারিং করেছেন, মিটার পেয়েছেন, মূল খুঁটি থেকে সার্ভিস তারও টানা হয়েছে মিটারে। দোকানে ফ্রিজ বসিয়েছেন, ঝুলিয়েছেন ফ্যান, নিয়েছেন একটি টেলিভিশনও। শুধু বিদ্যুতের সরবরাহ নেই।
সড়কে মাইলের পর মাইল দাঁড়িয়ে আছে বিদ্যুতের খুঁটি। ঝুলছে হাইভোল্টেজের ভারী তার। গ্রামে গ্রামে বসতঘর, বাজারের দোকান, স্কুল কিংবা মসজিদ-মাদরাসা; সবখানে করা হয়েছে ওয়ারিং। লাগানো হয়েছে বিদ্যুতের মিটারও। কিন্তু কোথাও জ্বলে না আলো। এ অবস্থা নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের দুটি ওয়ার্ডের। স্থানীয়রা জানান, প্রায় আট বছর আগে বিদ্যুৎ দেয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে কর্তৃপক্ষ। মিটার ও ওয়ারিংসহ নানা কাজে টাকাও দিয়েছেন তারা। সে থেকে এখনো পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের অপেক্ষায় অন্তত আড়াই হাজার পরিবার।
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে চোখে পড়ে করিম মার্কেট। ওই মার্কেটে ১৫টির মতো দোকানপাট রয়েছে। এর মধ্যে খোলা রয়েছে হাতে গোনা চার-পাঁচটি। এ মার্কেটের মুদি-মনিহরি দোকানি মো. হাসান। ২০১৮ সালের দিকে দোকানে ওয়ারিং করেছেন, মিটার পেয়েছেন, মূল খুঁটি থেকে সার্ভিস তারও টানা হয়েছে মিটারে। দোকানে ফ্রিজ বসিয়েছেন, ঝুলিয়েছেন ফ্যান, নিয়েছেন একটি টেলিভিশনও। শুধু বিদ্যুতের সরবরাহ নেই।
মো. হাসান জানান, যখন তিনি এখানে দোকান বসিয়েছেন, তখন দোকান ছিল চারটি। কিছুদিন পর এলাকায় যখন বিদ্যুতের সার্ভে আসে, তখন ধীরে ধীরে ওই এলাকায় দোকান বাড়তে শুরু করে। এর মধ্যে বিদ্যুতের খুঁটি স্থাপন ও লাইন টানতে শুরু করে। তিনিসহ ওই মার্কেটের অন্য দোকানিরাও ওয়ারিং করিয়েছেন, মূল খুঁটি থেকে সার্ভিস তার নিয়েছেন, এমনকি মিটারও বসিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, এক বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ হবে বলে জানিয়েছিল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২৬ সাল—আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিদ্যুৎ পাননি তারা। ফলে দোকানে স্থাপন করা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য বিনষ্ট হওয়ার পথে। বারবার বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েও মিলছে না সমাধান।
করিম মার্কেট থেকে বের হয়ে আশপাশের কয়েকটি বাড়ি, এক কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে ইসমাইল মার্কেট ও উত্তরে নয়নের মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থান ঘুরে একই চিত্র চোখে পড়ে। স্থানীয়রা জানান, সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের চর নোমান, চর আক্রাম উদ্দিন, চরলক্ষ্মী ও চর উরিয়া গ্রামের সব খানেই একই অবস্থা। চার গ্রামের সড়কে মাইলের পর মাইল বিদ্যুতের খুঁটি বসানো আছে। তাতে হাইভোল্টেজের তার ঝুলছে। গ্রামের বসতঘর, বাজারের দোকান, স্কুল-মসজিদ কিংবা মাদরাসা সবখানে করা হয়েছে ওয়ারিং। বিদ্যুতের মিটারও স্থাপন করা হয়েছে। খুঁটি থেকে মিটারে টানা হয়েছে সার্ভিস তার। শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। ফলে অবহেলা-অযত্নে খুঁটি ও তারে জড়িয়ে রয়েছে আগাছা। কোথাও খুঁটির সঙ্গে স্তূপ করে বেঁধে রাখা হয়েছে তার। কারো কারো ঘরের তারেও জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের মাকড়সার জাল।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক আবদুল কাদের। তিনি স্থানীয়ভাবে কৃষক নেতাও। আবদুল কাদের জানান, দীর্ঘ আট বছর এভাবেই পড়ে আছে সব। পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগ সব আয়োজন করলেও বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে পারেনি। এতে মিটারে মরিচা ধরেছে, ইলেকট্রনিক জিনিসপত্র নষ্ট হচ্ছে। আধুনিক বিশ্বায়নে বিদ্যুতের অভাবে প্রাত্যহিক নানা সংকটের পাশাপাশি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকসহ উপকারভোগীরা।
আব্দুল কাদের অভিযোগ করেন, তিনিসহ আশপাশের অনেক কৃষক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে অনেক সবজি উৎপাদন করতে পারছেন না। একই সঙ্গে অনেকে নিজ বাড়িতে গরুর খামার করেও বিপাকে পড়েছেন। অনেকে খামার বন্ধ করে দিয়েছেন। আবার বছরের পর বছর খামার নির্মাণ করেও গরু তুলতে পারছেন না খামারে।
স্থানীয়রা জানান, জেলার এ অঞ্চলে বছরজুড়ে কৃষিপণ্য উৎপাদন হচ্ছে। এখানকার বিভিন্ন সবজি পুরো জেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানেও যায়। কিন্তু এ অঞ্চলের মানুষ বিদ্যুৎবঞ্চিত। ২০১৮ সালের দিকে যখন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও লাইন টানছিল পল্লী বিদ্যুৎ, তখন সবাই আশা করেছিলেন এক-দেড় বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ পাবেন। কিন্তু আট বছর অতিবাহিত হলেও তারা বিদ্যুৎ পাননি।
কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এত আয়োজন করার পরও কেন এখনো বিদ্যুৎহীন হাজারো পরিবার, তা খতিয়ে দেখার পাশাপাশি দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেলা সদর দপ্তরে গেলে জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মকবুল আলম জানান, আট বছর আগের ঘটনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানে না। তবে খোঁজ নিয়ে কী করা যায় তা করার আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে কথা হয় নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা কোথায় সেটি খুঁজে দেখা হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
