প্রবাসীদের দেশে উদ্ভূত বিভিন্ন আইনি সমস্যা দ্রুত ও কার্যকরভাবে সমাধানের জন্য একটি বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে শরণার্থী ও অভিবাসন আন্দোলন বিষয়ক গবেষণা ইউনিট (রিমরু)—এর ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন এবং ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রিমরুর উপদেষ্টা ড. সি. আর. আবরার। এছাড়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেটো রেংলি।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রবাসীরা বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যে অর্থ দেশে পাঠান, অনেক সময় সেই অর্থ বা সম্পত্তি নিয়ে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এসব আইনি বিরোধের মামলা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকায় প্রবাসীদের যেমন অর্থ ও সময় নষ্ট হয়, তেমনি তারা চরম ভোগান্তির শিকার হন। এই দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি কমাতে প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত আদালত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বর্তমানে একটি খসড়া তৈরির কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
প্রবাসীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপে আলোকপাত করে মন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি ও তাদের পরিবার দেশের ভেতর যেকোনো আইনি সহায়তার প্রয়োজনে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা হটলাইন সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। প্রাথমিক আইনি দিকনির্দেশনা ও প্রতিকার পেতে এ ক্ষেত্রে ‘রিমরু’-কে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অভিবাসী শ্রমিকদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে অভিহিত করে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। তৈরি পোশাক, কৃষি, পাট ও পাটজাত পণ্য কিংবা চা রপ্তানির পাশাপাশি বিদেশে শ্রম রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে অনন্য ভূমিকা রাখছে। তবে শুধু কায়িক শ্রম নয়, বর্তমানে বিদেশে বাংলাদেশিদের মেধা ও দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সাম্প্রতিক দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রম ও দুর্ভোগের চিত্র তাঁর নজরে এসেছে। অনেক শ্রমিককে দীর্ঘ সময় কাজ করার পাশাপাশি কর্মস্থলে যাতায়াতেও অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়; অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পান। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই মজুরিবৈষম্য দূর করতে কার্যকর কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অভিবাসন খাতের অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইনমন্ত্রী বলেন, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও রিক্রুটিং এজেন্সি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য ভুয়া কাগজপত্র বা নথিপত্র তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এসব নথির সত্যতা যাচাই করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা বাতিল কিংবা ভিসা নবায়ন নিয়ে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের প্রতারণা ও অনিয়ম কঠোরভাবে প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও বেশি সতর্ক ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘রিমরু’-র তিন দশকের ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৯০-এর দশকেই অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ ও অধিকার সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটি যে দূরদর্শিতা দেখিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। গত ৩০ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি অভিবাসন ও শ্রমিককল্যাণসংক্রান্ত নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে।
রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রস্তাব একবারে বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলেও প্রতিষ্ঠানটির ইতিবাচক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে সরকার সর্বদা কাজ করতে আগ্রহী বলে জানান মন্ত্রী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, রিমরুর এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আগামী দিনের পথচলার শক্ত ভিত্তি হয়ে উঠবে। ভবিষ্যতে এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে, যেখানে প্রবাস থেকে ফিরে এসে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশেই বিদেশি নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
