মালদার ঐতিহাসিক আদিনা মসজিদ এবং জিতু সাঁওতালের আন্দোলন স্মারক প্রতীকী দৃশ্য।ছবি: সংগৃহীত
Published on
:
5 min read
আদিনার দেওয়ালে গুলির দাগ
ঋষি ঘোষ
"জীবিতের শোক মৃত গ্রহণ করে না"
আট ইঞ্চি লম্বা দু দিক ধারালো লিকলিকে ইস্পাতের ফলা এক ইঞ্চিরও কম দূরত্বে বেরিয়ে গেল পুলিশ সুপার হীরালাল সাহার কানের পাশ দিয়ে। মাথার ঝাঁকুনিতে উড়ে গেল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পুলিশের ইন্সিগ্নিয়া লাগানো সোলার হ্যাট।এসপি সাহেবের দেহরক্ষী সেপাই দলবাহাদুর সোনার আক্রমণ রুখতে এগিয়ে এসেছিল সামনে।ধারালো গুপ্তির দ্বিতীয় আঘাত তার মাথার নরম চামড়ার স্লাউচ হ্যাট ভেদ করে বেরিয়ে গেল।কপাল থেকে দরদর করে নেমে আসা রক্তে ভেসে গেল দলবাহাদুরের মুখ ও কপাল।৩৫ জন আর্মড পুলিশের কোম্পানিকে পরবর্তী আদেশ দেওয়ার জন্য পিছনের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা জেলাশাসক জে.এন.তালুকদারের দিকে একপলক তাকিয়ে এস পি স্বয়ং কোমরের হোলস্টার থেকে টেনে নিচ্ছিলেন ওয়েবলি স্কট রিভলভার...১৯২৫ এ ইম্পিরিয়াল পুলিশ সার্ভিসে জয়েন করে আর্মস ট্রেনিং নেওয়ার পর সার্ভিসে এই প্রথমবার-তখনই পিছন থেকে বেজে উঠলো আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়নের ইন্সপেক্টর টোকি সিং-এর বাজখাঁই গলা-"ফায়ার!ভলি ভায়ার!"মুহূর্তে গর্জে উঠলো সামনের সারির চারজন সেপাইয়ের লি এনফিল্ড এম কে-২ রাইফেল...ব্রিটিশ আর্মি ও পুলিশের যে স্ট্যান্ডার্ড ইস্যু প্রায় শতবর্ষ রাজত্ব করবে থ্রি নট থ্রি রাইফেল নামে।পুলিশ বাহিনীর দিকে মুখ করে হাতের গুপ্তি ঘোরাতে ঘোরাতে আঁকাবাঁকা দৌড় দিয়ে আদিনা মসজিদের থামের আড়ালে চলে যেতে চাইছিলো ছোটখাটো কালো শরীরটা।লাফিয়ে দুটো গুলি এড়িয়ে গিয়েও সিঙ্গল অ্যাকশন বোল্ট রাইফেলের তিন নম্বর গুলি তার ডান চোখ ভেদ করে মাথার পিছন দিয়ে বেরিয়ে গেল।হাওয়ায় চিৎসাঁতার দেওয়ার মতো করে ফুটতিনেক দূরে আছড়ে পড়লো দেহটা...দু চোখ খোলা রেখে আদিনার ঘাসে পড়ে রইলো জিতু সর্দারের দেহ।তারিখটা ১৪ ডিসেম্বর,১৯৩২।
গোয়েন্দা পুলিশের রেকর্ড তাকে কখনো সর্দারের মর্যাদা দেয়নি।কখনো সেখানে সে জিতু হেমব্রম কখনো বা জিতু সাঁওতাল; আবার কখনো জিতু অ্যালিয়াস গান্ধী সাঁওতাল।৪৮ রাউন্ড ফায়ারিং এর পর আশপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আরো চারজনের মৃতদেহ।আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছে জনা পাঁচেক।আদিনা মসজিদের ভিতর থেকে জিতুর বাহিনীর ছোঁড়া তীরে লড়াইয়ের প্রথম দফায় আহত হয়েছিলো যে সিপাহি,সেও ঢলে পড়েছে মৃত্যুর কোলে।আহত সিপাহি জনাতিনেক-সকলেই তীরের জখম।
সমকালের খ্যাতনামা সাপ্তাহিক 'গৌড়দূত' সম্পাদক লালবিহারী মজুমদার পরবর্তীতে লিখবেন,হতাহতের সংখ্যা আরো বেশি।অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতেও লালবিহারী তুলে ধরবেন এক নিষ্ঠুর সত্য-"শ্রীযুক্ত তালুকদার জানিতেন না যে জিতু আমার অত্যন্ত ভক্ত ছিল।জানিয়া পরে একদিন দুঃখ করিয়া বলিয়াছিলেন- তখন যে কত লোক লইয়া গেলাম,আপনাকে লইয়া গেলে হয়তো বা গুলি চালাইবার প্রয়োজন হইত না।"মালদার ইংরেজবাজারে মজুমদারদের বাসগৃহ 'শান্তিনিবাস' এর নিচের একটি ঘরকে বলা হতো 'ডিসপেনসারি ঘর'।পারিবারিক সূত্র থেকে এখনো বলা হয়,সেই ঘরের সামনের বারান্দা জিতুর সেই বাড়িতে একাধিক আগমনের সাক্ষী।
অন্যান্য অনেক বিপ্লবীর মতো জিতু সাঁওতালকে স্বাভাবিক নিয়মে ভুলেই ছিলো সবাই।আবার তাঁকে,তাঁর বিপ্লবকে নতুন ভাবে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন ঐতিহাসিক তনিকা সরকার।সালটা ১৯৮৫।ইতিহাস চর্চার নতুন দিগন্ত তৈরি করা রণজিৎ গুহ সম্পাদিত 'সাবলটার্ন স্টাডিজ'এর চতুর্থ খন্ডে তার ছকভাঙা প্রবন্ধ 'জিতু সান্তাল'স মুভমেন্ট ইন মালদা(১৯২৪-১৯৩২)'তে তিনি এই আন্দোলনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক মাত্রাগুলিকে নতুনভাবে তুলে ধরেন। গৌতম ভদ্রের 'ইমান ও নিশান'সহ এই ঘরানার অনেক ঐতিহাসিকের রচনায় জিতুর আন্দোলনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছেন নানাভাবে।পরবর্তী প্রজন্মের ঐতিহাসিকদের মধ্যে অসীম কুমার সরকার তার 'চেঞ্জিং প্রোফাইল অফ এ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট মালদা(১৯৩২-১৯৫০)'বইতেও এই আন্দোলন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ করেছেন।
হত আর হন্তারকের মধ্যে;বিদ্রোহী জিতু আর হত্যাকারী ইংরেজের মাঝে মিশে গেছে ঐতিহাসিক 'শাঁস'এর সঙ্গে সমপরিমাণ গল্পের 'আঁশ'।জিতুর আত্মবলিদান দিয়ে গান বেঁধেছেন কিংবদন্তি গম্ভীরা শিল্পী সুফি মাস্টার।কোতোয়ালির জমিদার আবুল হায়াত খান চৌধুরীর জারি করা দুই তৃতীয়াংশ ফসলের ভাগ দেওয়ার ফরমানের বিরুদ্ধে জিতুর লড়াইকে বাহবা দিতে সুফি সামান্যতম কুণ্ঠা করেননি-গম্ভীরার রীতি মেনে সম্প্রদায় সেখানে তিলমাত্র বাধা হয়ে ওঠেনি।বহু ঐতিহাসিক গবেষণাপত্রে এমন উল্লেখও আছে-আদিনা মসজিদকে কার্যত দুর্গ বানিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জিতুর বাহিনীর বিরুদ্ধে ইংরেজ পুলিশের সঙ্গে বন্দুকধারী সিপাহিসহ উপস্থিত ছিলেন কোতোয়ালির জমিদার খান চৌধুরী সাহেব;সঙ্গে ইংরেজবাজারের জমিদার আশুতোষ চৌধুরী।অনেকে বেশ জোর দিয়ে বলেন:ইংরেজ পুলিশ নয়,খান চৌধুরীদের বেসরকারি গুলিতেই জিতুর মৃত্যু হয়েছে।এই মিথ এখনো হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়-বহু গবেষক এতে দ্রুত সিলমোহর দিয়ে সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিকোণকে হয়তো অজান্তেই কিছুটা প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেন।
সময়ের ধুলো আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পেরিয়ে চর্চায় উঠে এসেছে সেইসময়ের মালদা জেলা পুলিশ সুপার হীরালাল সাহার অধুনা দুষ্প্রাপ্য আত্মজীবনী 'আমার পুলিশী জীবন'।মালদায় প্রায় তিন বছরের বেশি সময় কর্মজীবনের বিবরণের পাশাপাশি গুলি চালানোর দিনটির ঘটনাও খুব নির্মোহভাবে লিপিবদ্ধ করে গেছেন তিনি।ঔপনিবেশিক যুগের সরকারি আমলা বা পুলিশের আত্মবিবরণী ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসাবে আজ স্বীকৃত।হীরালালের এই আত্মজীবনীকে কৃষক চৈতন্যের অন্যতম প্রতিভূ জিতু সাঁওতালের মূল্যায়নের একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি পাঠ করা যায়,তাহলে কিছু কিছু তথ্য ও বিশ্লেষণ হীরকখণ্ডের মতো আজও ঝলসে উঠবে।বিশের দশকের প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতকোত্তর প্রাক্তনী হীরালাল সাহা যখন পুলিশ বিভাগে যোগদান করেন,তখন প্রাথমিকভাবে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তথাকথিত 'দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী' এই তরুণ সে চাকরি টিকিয়ে রাখতে পারবেন কিনা।১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ জুলাই অ্যাডিশনাল এসপি হিসেবে চাকরিতে যোগদান করে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন শেষ হয় ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ডিআইজি হিসেবে।অর্থাৎ,হীরালাল সেই বিরল পুলিশ আধিকারিকদের একজন,যিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান পুলিশ এবং স্বাধীন ভারতের পুলিশ ব্যবস্থার আদিযুগ-দুটির মধ্য দিয়েই পেশাজীবন কাটিয়েছেন।২২টি অধ্যায় বিভক্ত ২২১ পৃষ্ঠার এই আত্মজীবনীর আনুমানিক প্রকাশকাল ১৯৬৬।কলেজ স্ট্রিটের অঅধুনালুপ্ত 'ভারত প্রকাশ ভবন' ছিল এই বইটি প্রকাশক।
ছাত্রজীবনে অধ্যাপক জে.এন.দাশগুপ্তর ক্লাসে বসে শেলি-কিটস-বায়রন পড়া হীরালাল আত্মজীবনীতে একেবারে ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট ভঙ্গিতে তাঁর দীর্ঘ চাকরিজীবনের ঘটনাগুলিকে সাজিয়ে গেছেন।আলাদাভাবে তাকে সাহিত্যরসোত্তীর্ণ করার কোন সচেতন প্রয়াস তাঁর লেখায় নেই। একটু তলিয়ে পড়লে বোঝা যাবে-সেটা তাঁর উদ্দেশ্যও নয়। ৯৭ থেকে ১১৭ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিন্যস্ত 'মালদহে কিঞ্চিদুর্ধ্ব তিন বৎসর' শীর্ষক অধ্যায় তিনি জিতুর গুলি চালনা বিষয়ক খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু ধোঁয়াশা স্পষ্ট করে দিয়েছেন।যেমন-পরিষ্কার বলে দিয়েছেন কোতোয়ালির খান চৌধুরী এবং ইংরেজবাজারে চৌধুরী জমিদাররা অকুস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাদের সঙ্গে কোন বন্দুকধারী সিপাহি নিতে স্পষ্টতই বারণ করা হয়েছিলো।কেননা,সেই সময়ে ব্রিটিশ পুলিশের রীতি অনুসারে অভিযোগকারী ও সমাজের বিশিষ্ট মানুষ হিসাবে তাদেরকে শুধু প্রতিপক্ষকে বোঝানোর দায়িত্ব দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো।যদিও খান চৌধুরীদের জমিদারি এলাকা গাজোল এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় জিতুর আন্দোলন যে চরমপর্যায়ে পৌঁছেছিলো,হীরালাল তা স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।
দ্বিতীয়ত,পুলিশ ম্যানুয়াল না মেনে গুলি চালানোর আদেশ দেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে ডিভিশনাল কমিশনার ড্রামন্ড এবং ডিআইজি ভাগলপুর ওয়াকার সাহেব যে ডিপার্টমেন্টাল এনকোয়ারি বসিয়েছিলেন ,তার উল্লেখও তিনি করেছেন।প্রায় ৬০ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে ৪৮ রাউন্ড ফায়ারিং রেশিও যথেষ্ট বেশি হলেও প্রায় হাজারের কাছাকাছি তীর-ধনুক,বল্লম,টাঙ্গি ও গুপ্তিধারী সাঁওতাল বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করতে এছাড়া উপায় ছিল না-এমন আত্মপক্ষ সমর্থনও তাঁকে করতে হয়েছে।নিজে আহত/নিহত হতে হতে বেঁচেছেন...ঘটনার অভিঘাতে মানসিক ধাক্কায় বেশ কিছু সময়ের জন্য মুহ্যমান হয়ে মাটিতে বসে পড়েছিলেন-এমন কথাও উল্লেখ করতে ভোলেননি । পাশাপাশি এটাও উল্লেখ করেছেন-এই হিংসার আশ্রয় নেওয়া তিনি মানসিক দিক থেকে মেনে নিতে পারেননি।
তাই আর্মড পুলিশ ইন্সপেক্টর টোকি সিং(যিনি দলের মধ্যে নিরস্ত্র হয়ে ঢুকে জিতুকে আলাদাভাবে ডেকে এনে এসপি সাহেবের সামনে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিলেন)এবং বডিগার্ড কনস্টেবল দলবাহাদুর সোনার(জিতুর গুপ্তিতে আহত) জেলাশাসকের সুপারিশে পুলিশ মেডেল পেলেও তাঁর নাম যে সুপারিশ হয়নি-এতে তিনি আশ্বস্ত হওয়ার ইঙ্গিত করেছেন।এই অপ্রাপ্তি তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে।তার প্রেসিডেন্সি-লালিত শিক্ষিত মনন সরল,বিশ্বাসী,একগুঁয়ে সাঁওতাল তরুণটির জন্য নীরবে অশ্রুমোচন করেছে আর দাঁতে দাঁত চেপে তিনি পেশাদারি দায়িত্ব সামলে গেছেন...সেই যে বাঙালির অপরাজেয় কথাশিল্পী 'পথের দাবি' উপন্যাসে লিখেছিলেন:"...কর্তব্য!এই ছোট কথাটির আড়ালে জগতের কত ভালো আর কত মন্দই না লুকাইয়া রহিয়াছে।"
বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের ২৮ ফেব্রুয়ারি,১৯৩৩ এর ৪১তম কনফিডেন্সিয়াল প্রসিডিংসে জিতু সাঁওতাল,বারকা সাঁওতাল,জেখা সাঁওতাল ছাড়াও দুজন অজ্ঞাতপরিচয় নিহতের উল্লেখ পাওয়া যায়। আর আহতদের তালিকায় নাম আছে ছোটকা সাঁওতাল,মানো সাঁওতাল,কাঁচু সাঁওতাল সহ অজ্ঞাতপরিচয় একজনের।ইতিহাস বলছে,জিতুর গুরু ছিলেন ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত 'সত্যম্ শিবম সম্প্রদায়'খ্যাত নেতা দিনাজপুরের কাশীশ্বর চক্রবর্তী-যাঁর ভূমিকা নিয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাপত্র লেখা হয়েছে।তাঁর ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই ৭ মে ১৯২৭ জিতু প্রথমবার আদিনা প্রাঙ্গনে কালীপূজা করেন। বস্তুতপক্ষে,গান্ধী রাজত্বের স্বপ্নে বিভোর জিতু বিশ্বাস করতেন আদিনা মসজিদ প্রকৃত প্রস্তাবে আদিনাথ তথা শিবের মন্দির।আজকে হিন্দুত্বের ধজাধারী একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল যখন প্রায় সমজাতীয় ধারণা তৈরি করে এই ঐতিহাসিক সৌধ প্রাঙ্গনে পূজাপাঠ করে এক ভিন্ন মাত্রা দিতে চায়;তখন ইতিহাসের অনুক্রম ছাড়া তাকে আর কিছুই বলা যায় না।
বিপজ্জনক হলেও এই ধারণার একাধিক প্রমাণ আছে বিতর্কিত ও স্বল্প আলোচিত গম্ভীরাশিল্পী বিপিন খলিফার বাঁধা একাধিক গম্ভীরা গানে।যেখানে স্পষ্টই মন্দির ভেঙে মসজিদ বানানোর বিষয়টি উঠে এসেছে।৩ ডিসেম্বর ১৯৩২ হাজার খানেক অনুগামীসহ জিতু আদিনা মসজিদের দখল নেন।১১ দিন পর জিতুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তা দখলমুক্ত হয়-আদিনার দেওয়ালে শুধু থেকে যায় বুক আর মাথার উচ্চতায় গুলির দাগগুলো।নারকেলবেড়িয়ায় তিতুমিরের বাঁশের কেল্লা বানানোর সঙ্গে আদিনাকে দুর্গে পরিণত করার এই ধারণার একটা সুদূর অভেদ কল্পনা করা খুব কষ্টকর নয়।
লালবিহারী মজুমদারের সেই অপ্রকাশিত আত্মজীবনীর সূত্র থেকেই জানা যায়-জিতু আর নিহত পুলিশকর্মীর দেহ পুলিশি প্রহরায় দাহ করা হয় ইংরেজবাজারের অন্তর্গত বোঁচাটাক শ্মশানে।হত আর হন্তারক পাশাপাশি আগুনের বিছানায়।নয়ের দশক থেকে সেই শ্মশান পরিত্যক্ত।জেলার প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান মালদা কলেজে ছেলেদের ছাত্রাবাসের নামকরণ ছাড়া সাধারণ জনমানসে জিতু আজ আর কোথাও নেই...এই নির্লজ্জ বিস্মৃতিই স্বাভাবিক,নিয়তিতাড়িতও বটে।
গ্রেফতার হওয়া সাঁওতালদের সঙ্গে কথোপকথন চালিয়ে হীরালাল আবিষ্কার করেছিলেন জিতুকেই তাঁরা 'গান্ধী সাঁওতাল' নামে ডাকতেন-তিনি ভেবেছিলেন দুই ব্যক্তি আলাদা।রিপোর্টে এই বিশেষ নামকরণের উল্লেখও করেছেন তিনি।সতীনাথ ভাদুড়ীর 'ঢোঁড়াই চরিতমানস'-এর ঢোঁড়াইয়ের জীবনে মহাত্মা গান্ধি এসেছিলেন ঢোঁড়াই-এর মতো করেই...'গানহী বাওয়া' থেকে 'গান্ধী মহারাজ' হয়ে 'গান্ধীজী' পর্যন্ত এই দূরবীনের উল্টোদিকের হয়ে-ওঠার সীমান্তেই 'ইন্ডিয়া' শেষ হয়ে 'ভারতবর্ষ' শুরু হয়...গান্ধিয়ান স্টাডিজ না-পড়া জিতু সেই সীমানাকে পেরিয়ে যাওয়ার মন্ত্র জানতেন।
