জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে দ্বিপক্ষীয় সফরে ২৬ অক্টোবর টোকিও যাচ্ছেন প্রধানন্ত্রী তারেক রহমান। ২৭ অক্টোবর টোকিওতে দুই শীর্ষ নেতা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এ সফরে দুই দেশের মধ্যে ৫ থেকে ৬টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে। তবে কোনো চুক্তি সই হওয়ার সম্ভবনা নেই।
উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বাইরে প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফর একটি বিস্তৃত ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা যুক্ত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কের ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ এখনই অন্য কোনো পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না। কিন্তু এ সফরে সম্পর্কের মাত্রা বোঝাতে নতুন কিছু শব্দ যুক্ত করার বিষয়ে সম্মত আছে ঢাকা-টোকিও।
ঢাকা ও টোকিওর কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সরকারপ্রধানের সফরে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় জাপানের কাছে ২০০ কোটি ডলারের সহায়তা চাইতে পারে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশে জাপানি অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়নের খরচ কমানোর বিষয়টি গুরত্ব দিবে ঢাকা। এছাড়া বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন, মানবসম্পদের মতো বিষয়ে গুরুত্ব দিতে পারে ঢাকা।
অন্যদিকে, টোকিও ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’-এর আওতায় এ সরকারের সঙ্গেও সব ধরনের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিতে পারে। পাশাপাপশি জাপান হালনাগাদ অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক (এফওআইপি) বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে তাদের পাশে চাইবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর জুনে মালয়েশিয়া হয়ে ও চীন সফর করেছেন তারেক রহমান। সরকারপ্রধানের বেইজিং সফরের পর টোকিও সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর টোকিও সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সফরে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প ও জনশক্তি রপ্তানির অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রাধান্য পেতে পারে।
সরকারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেট্রোরেল উন্নয়ন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগসহ বেশ কিছু মেগা প্রকল্প জাপানি সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে জাপানি ঋণের সুদের হার নিয়ে চিন্তিত সরকার। কেননা, সুদের হার ক্রমেই বাড়াচ্ছে জাপান। আর বাংলাদেশ সরকার চাইছে, সুদের হার কমাতে। কেননা, সুদের হার বেড়ে গেলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাবে।
সম্প্রতি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, আমাদের জাপান সফরের প্রধান অগ্রাধিকার হবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গভীর করা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
জাপানকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ও দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদার উল্লেখ করে তিনি জানান, দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে জাপানি বিনিয়োগ দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। আসন্ন সফরে বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের আগে জাপানের সঙ্গে কর্মসংস্থান সংক্রান্ত ‘ইএসডিপি-এমওসি’ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু করবে জাপান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সময় চুক্তির কপি আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পক্ষের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে।
১৭ অক্টোবর দুই দেশের মধ্যে ‘মেমোরেন্ডাম অব কো-অপারেশন অন এমপ্লয়মেন্ট স্কিলস ডেভেলপমেন্ট’ (ইএসডিপি-এমওসি) চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর। মেয়াদ শেষে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছরের জন্য বৃদ্ধি পাবে। ফলে চুক্তিটির সামগ্রিক মেয়াদ হবে ১০ বছর। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, কর্মী পাঠানো ও গ্রহণের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এক মাসে স্বাক্ষরিত জাপান–বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (ইপিএ) চুক্তি সই করেছে। উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি), ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের মতো অবকাঠামো প্রকল্পগুলো বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট (বিগ-বি) ধারণার আওতায় জাপানের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ।
সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী জাপান সফরে যাবেন। সফরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীরা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। তারা সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করবেন। তাদের বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে বলে আমরা আশা করছি। আলোচনায় ৫ থেকে ৬টি এমওইউ রয়েছে। বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব‘-এ আছে। সম্পর্ক বোঝাতে এখানে এবার নতুন কিছু শব্দ যুক্ত হতে পারে।
গত এপ্রিলের শেষ দিকে, জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্যমন্ত্রী নরিকাজু সুজুকি ঢাকা সফর করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির লেখা একটি চিঠি প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। এরপর আগস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের আলোচনা প্ল্যাটফর্ম ফরেন অফিস কনসালটেশনে (এফওসি) তারেক রহমানের জাপান সফর নিয়ে আলোচনা হয়। পরবর্তীতে উভয় পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে তারেক রহমানের টোকিও সফরের তারিখ চূড়ান্ত করেছে।
এনআই/এসএইচএ
