সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ভাবনা যেমন বদলায়, তেমনি অনেক প্রিয় বন্ধুত্বও একসময় ফিকে হয়ে আসতে পারে।
জীবনের কোনও এক মোড়ে এসে মনে হতে পারে, এই সম্পর্ক কি আদৌ আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব?
স্বাস্থ্য ও জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে নিউ ইয়র্কের মনোবিদ ও বন্ধুত্ব-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. আইরিন এস লেভিন এবং মনস্তত্ত্বের অধ্যাপক ডা. জেরালিন ডেক্সটার জানিয়েছেন, কীভাবে বুঝবেন একটি বন্ধুত্বের মেয়াদ শেষ হয়ে এসেছে এবং কখন সেই সম্পর্ক থেকে সম্মানজনকভাবে বিদায় নেওয়া উচিত।
ডা. আইরিন এস লেভিনের মতে, “কোনও বন্ধনই একশো ভাগ নিখুঁত হয় না। তবে কোনও বন্ধুত্বে যদি আপনি দিনের পর দিন কেবলই অসুখী বা মানসিক চাপে থাকেন, তবে বুঝতে হবে সম্পর্কটির স্বাভাবিক সমাপ্তি ঘটেছে।”
“বন্ধুত্ব একটি স্বেচ্ছামূলক সম্পর্ক, যা আনন্দ দেবে, মানসিক যন্ত্রণা নয়”, বলেন তিনি।
বন্ধুত্ব ফুরিয়ে যাওয়ার ৫টি প্রধান লক্ষণ
বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা সতর্ক সংকেতের কথা বলেছেন, যা ইঙ্গিত করে যে বন্ধুত্বটি আর সুস্থ অবস্থায় নেই।
যোগাযোগের একতরফা চেষ্টা: দুজনের কেউই আর একে অপরের সঙ্গে দেখা করার বা কথা বলার কোনও আগ্রহ বা চেষ্টা দেখান না।
ঘনঘন পরিকল্পনা বাতিল করা: কোনও কারণে দেখা করার কথা হলেও, শেষ মুহূর্তে অজুহাত দিয়ে বারবার তা বাতিল হয়ে যায়।
ভুল বোঝাবুঝি ও জটিলতা: সাধারণ আলোচনাও এখন খুব কঠিন মনে হয় এবং যেকোনও কথায় সহজেই ভুল বোঝাবুঝি বা তর্কের সৃষ্টি হয়।
মানসিকতার চরম অমিল: জীবনের লক্ষ্য, শখ বা চিন্তাভাবনায় এতটাই দূরত্ব তৈরি হয় যে, এখন আর দুজনের মধ্যে কথা বলার মতো সাধারণ কোনও বিষয় অবশিষ্ট থাকে না।
নেতিবাচক ও নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ: বন্ধু যদি সারাক্ষণ আপনার বিচার করতে বসে, আপনার ভালো কাজে ঈর্ষা প্রকাশ করে, আপনার ব্যক্তিগত সীমারেখাকে সম্মান না দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তবে সেটা একটি বিষাক্ত বন্ধুত্বের লক্ষণ।
এটি কি সাময়িক দূরত্ব নাকি স্থায়ী ফাটল?
অনেক সময় কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক ব্যস্ততা বা অসুস্থতার কারণেও বন্ধুত্বের সম্পর্কে সাময়িক দূরত্ব তৈরি হতে পারে, যার অর্থ এই নয় যে সম্পর্কটি শেষ।
তবে ডা. লেভিন বলেন, “বন্ধুত্ব ভাঙার জন্য সবসময় বড় কোনও ঝগড়া বা নাটকীয়তার প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় মানুষ কোনও দোষ ছাড়াই জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়।
সম্পর্ক ভাঙার আগে মেরামতের চেষ্টা কি জরুরি?
যদি সত্যিই সেই পুরানো বন্ধুকে মূল্যায়ন করেন, তবে সরাসরি দূরত্ব তৈরি না করে একবার খোলামেলা কথা বলার চেষ্টা করা উচিত।
ডা. লেভিনের পরামর্শ অনুযায়ী, “আপনি বলতে পারেন— ‘ইদানীং আমাদের মধ্যে কেমন একটা দূরত্ব লক্ষ্য করছি। আমার ধারণা তোমারও তেমনটাই মনে হচ্ছে। চলো দুজনে বসে কথা বলি যে কোথায় সমস্যা হচ্ছে।’
যদি তাতেও কাজ না হয়, তবে কিছুদিন দূরত্ব বজায় রাখা বা দলগতভাবে বন্ধুদের আড্ডায় দেখা করা যেতে পারে।
বিশেষ করে পুরানো বন্ধুদের ক্ষেত্রে এটি এক প্রকার ‘স্মৃতির বই’-এর মতো কাজ করে। তাই হঠাৎ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিজেদের কিছুটা সময় দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সুন্দরভাবে বিদায় নেওয়ার পন্থা
সব বন্ধুত্বে আনুষ্ঠানিক বিদায় বা আলোচনার প্রয়োজন পড়ে না। যদি দুজনেই যোগাযোগ করা বন্ধ করে দেন, তবে সময় নদীপ্রবাহের মতোই বন্ধুত্বটি নিজে থেকেই মিলিয়ে যায়।
তবে অন্য পক্ষ আপনাকে ছাড়তে না চাইলে, স্পষ্ট করে বলতে হবে— ‘অতীতের দিনগুলোর জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তবে আমার মনে হয় এই সম্পর্কটি এখন আর আমাদের কারও ভালো করছে না। তাই কিছুদিন বিরতি নেওয়া দরকার।’
তবে মনে রাখতে হবে, যদি কোনও বন্ধুত্ব মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা হুমকিস্বরূপ হয়, তবে নিজের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তির খাতিরে কোনও প্রকার আলোচনা ছাড়াই সম্পূর্ণ যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হবে নিরাপদ সমাধান।
