আমাদের চারপাশে এমন মানুষ আছেন, যারা ছোট ছোট কাজও করতে পারেন না—একটা মেসেজের উত্তর দেওয়া, গোসল করা, বাজারে যাওয়া, এমন স্বাভাবিক কাজগুলো করাও সম্ভব হয় না তাদের পক্ষে। ঘটনাটিকে আমরা সহজেই বলে ফেলি: "আলস্য," "ইচ্ছাশক্তির অভাব," "একটু চেষ্টা করলেই তো হয়।"
কিন্তু জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাটিয়াস পিলনি তাঁর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন—এই সহজ ব্যাখ্যাটি সম্পূর্ণ ভুল । কারণ প্রেরণা কোনো "জ্বালানি ট্যাংক" নয়, যা ভরা বা খালি থাকে। প্রেরণা হলো একটি অবিরাম চলমান খরচ-লাভের হিসাব (cost-benefit analysis), যা আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত করে—সচেতনভাবে নয়, প্রায় অদৃশ্যভাবে।
এই হিসাবটি ব্যাখ্যা করলে মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের কষ্ট বোঝা সহজ হয়—এবং তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে পারে। এক্ষেত্রে প্রেরণার অদৃশ্য হিসাব সামনে আসে, যাতে রয়েছে তিনটি প্রশ্ন। কারণ, প্রতিটি কাজের আগে আমাদের মস্তিষ্ক তিনটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজে:
প্রথমত, কতটা পরিশ্রম লাগবে?—এই কাজটি করতে কত শক্তি ব্যয় হবে?
দ্বিতীয়ত, কতটা পুরস্কার পাওয়া যাবে?—এই পরিশ্রমের বিনিময়ে কী পাওয়া যাবে, এবং তা কি যথেষ্ট?
তৃতীয়ত, পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা?—আমি যদি চেষ্টা করি, সত্যিই কি পুরস্কার পাব?
এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়—কাজটি করা যাবে কি না। সাধারণত এই হিসাব আমাদের সাহায্য করে—আমরা অকারণে ক্লান্ত হই না, অযথা হতাশ হই না, সময় নষ্ট করি না। কিন্তু এই হিসাব যখন ব্যাহত হয়, তখন মানুষ কাজ করতে পারে না—এবং বাইরে থেকে তা "আলস্য" বা "উদাসীনতা" মনে হয়।
তাই সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা হলো এই যে, মানসিক রোগে হিসাব কীভাবে বিকল হয়? জার্মানির হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক মাটিয়াস পিলনির দল ৬৮টি গবেষণার মেটা-বিশ্লেষণ করে দেখেছেন—সিজোফ্রেনিয়া, ডিপ্রেশন ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত মানুষেরা পুরস্কারের জন্য পরিশ্রম করতে কম আগ্রহী হন, অন্যদের তুলনায়। এই কম আগ্রহ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার ডিসঅর্ডারে এবং কম কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ মাত্রায় ডিপ্রেশনে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সাধারণত পুরস্কার বড় হলে বা নিশ্চিত হলে মানুষ বেশি পরিশ্রম করে। কিন্তু এই রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেই সামঞ্জস্য দুর্বল হয়ে পড়ে। পুরস্কার বড় হলেও তারা সমানভাবে পরিশ্রম বাড়ায় না—তাদের ভেতরের হিসাব ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।
কেন এই বিকলতা? তিন রোগে তিন ধরনের কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কম্পিউটার-ভিত্তিক মডেলিং ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন—প্রতিটি রোগে প্রেরণার সমস্যার কারণ ভিন্ন। যেমন:
সিজোফ্রেনিয়ায় তথ্য একত্রিত করার সমস্যা দেখা যায়। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে পরিশ্রম, পুরস্কার ও সম্ভাবনা—তিনটি তথ্যই সিদ্ধান্তে কম প্রভাব ফেলে। সমস্যাটি হলো তথ্য একত্রিত করা ও ব্যবহার করা। ধরুন, কেউ চাকরির আবেদন করতে চান। তার আগে তাকে ভাবতে হবে—আবেদন করতে কত পরিশ্রম, চাকরি পেলে কী লাভ এবং চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা। এই তিনটি তথ্য একসঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যদি কঠিন হয়, তবে কাজটি overwhelm করে তুলতে পারে। ফলে ব্যক্তি সহজ কাজ বেছে নেন বা কাজটি ফেলে রাখেন।
ডিপ্রেশনে পরিশ্রমই বেশি ভারী মনে হয়। কারণ, ডিপ্রেশনে চিত্র ভিন্ন। এখানে পুরস্কার আকর্ষণীয় থাকলেও পরিশ্রমটা খুব বেশি ভারী মনে হয়। ধরুন, কেউ জানেন বন্ধুর সঙ্গে দেখা করলে ভালো লাগবে। কিন্তু পোশাক পরা, বাড়ি থেকে বেরোনো, পথ চলা, কথা বলা—সবকিছুই পাহাড়সম মনে হয়। পুরস্কার আছে, কিন্তু পথটি অতিক্রম করা অসম্ভব মনে হয়।
বাইপোলার ডিসঅর্ডারের ক্ষেত্রে অবস্থাভেদে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। বাইপোলার ডিসঅর্ডারে রোগের নানামুখী অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। স্থিতিশীল অবস্থায় মানুষ পরিশ্রম ও পুরস্কারের হিসাব তুলনামূলকভাবে ভালো করতে পারেন। কিন্তু depressive পর্বে ডিপ্রেশনের মতোই পরিশ্রম বেশি ভারী মনে হয়। আর ম্যানিক বা হাইপোম্যানিক পর্বে উল্টো চিত্র—পুরস্কার অতিরিক্ত বড় মনে হয়, পরিশ্রম একেবারেই ভারী মনে হয় না। ফলে কেউ কেউ কয়েক রাত জেগে কাজ করেন, সম্পত্তি বিক্রি করে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন—অথচ বাস্তবে সেই পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
গবেষক পিলনি লিখেছেন, "তুমি শুধু শুরু করো" বা "একবার করলেই ভালো লাগবে"—এই ধরনের কথা মানুষের কাছে হতাশাজনক শোনায়, কারণ এতে বোঝা যায় যে সমস্যাটি কেবল ইচ্ছাশক্তির অভাব । কিন্তু প্রকৃত সমস্যা হলো অদৃশ্য হিসাবের ভারসাম্যহীনতা। আর সেই হিসাব বোঝার জন্য প্রয়োজন সহানুভূতি ও কৌতূহল—দোষারোপ নয়।
তিনি পরামর্শ দেন, জিজ্ঞেস করুন: আসলে কোন জিনিসটি কঠিন মনে হচ্ছে? পরিশ্রমটা কি খুব বেশি? পুরস্কারটা কি অনেক দূরে? ফলাফলটা কি অনিশ্চিত? কাজটা কি পরিকল্পনা করার জন্য খুব জটিল? এই প্রশ্নগুলো "চেষ্টা করো" বলার চেয়ে অনেক বেশি সহায়ক।
চিকিৎসার দিক থেকে বলা যায় এসব সমস্যার সমাধান একই নয়। গবেষণা দেখায়—প্রেরণার সমস্যার কারণ ভিন্ন হলে সমাধানও ভিন্ন হতে হবে। যেমন:
ডিপ্রেশনে সহায়ক হতে পারে পুরস্কারকে আরও স্পষ্ট, তাৎক্ষণিক ও আবেগগতভাবে ধরা যায় এমন করে তোলা। যেমন: "বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা আমার জন্য ভালো"—এর বদলে বলা যেতে পারে "১০ মিনিট কথা বলার পর আমি সাধারণত একটু কম একাকী বোধ করি।"
সিজোফ্রেনিয়ায় সহায়ক হতে পারে কাজকে ছোট ছোট ধাপে ভাগ করা এবং পরিকল্পনায় সহায়তা করা। আবার, বাইপোলার ডিসঅর্ডারে অবস্থাভেদে ভিন্ন কৌশল প্রয়োজন।
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনও অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়। অথচ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ১৬.৮ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন, কিন্তু চিকিৎসা নিচ্ছেন মাত্র এক শতাংশেরও কম ।
তাই বাংলাদেশের বাস্তবতায় পিলনির গবেষণা তিনটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ: প্রথমত, এটি প্রমাণ করে—প্রেরণার অভাব "দুর্বলতা" নয়, এটি একটি স্নায়বিক প্রক্রিয়ার ব্যাঘাত। এই বোঝাপড়া মানসিক রোগীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করতে পারে। দ্বিতীয়ত, এটি চিকিৎসকদের জন্য নির্দেশনা দেয়—একটি চিকিৎসা সবার জন্য নয়; রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, এটি সাধারণ মানুষের জন্যও শিক্ষণীয়—নিজের বা প্রিয়জনের "আলস্য"কে দোষারোপ করার বদলে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
অতএব, মানসিক রোগে আক্রান্ত মানুষের প্রেরণার অভাব কোনো চরিত্রগত দোষ নয়। এটি একটি অদৃশ্য হিসাবের ভারসাম্যহীনতা—যা তারা নিজেরাই চান না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন না। তাই তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত সহানুভূতিশীল, কৌতূহলী ও সহায়ক। "তুমি শুধু চেষ্টা করো" বলার বদলে জিজ্ঞেস করা উচিত: "কোন জিনিসটি তোমার জন্য সবচেয়ে কঠিন মনে হচ্ছে?" কারণ কখনো কখনো নিষ্ক্রিয়তা হলো একটি অদৃশ্য হিসাবের দৃশ্যমান ফল—যা দোষারোপ নয়, বোঝাপড়া দাবি করে । আর এই বোঝাপড়াই পারে একজন মানুষকে তার নিজের হিসাব পুনর্বিন্যাস করতে সাহায্য করতে—এবং হয়তো একটি ছোট কাজ শুরু করে মানসিক বিঘ্নের দেয়াল ভেঙে অনেক বড় সাফল্য এনে দিতে।
