কালবেলা · সাধারণ
একটি থাপ্পড়...! টনক নড়বে কি সমাজের...?
২৪/১০/২০২৬

একটি থাপ্পড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েক সেকেন্ডের দৃশ্য। আর সেই দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক শিশুর আতঙ্ক, এক বাবার অসহায় ক্রোধ এবং আমাদের সমাজের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অস্বস্তিকর এক প্রশ্ন- সন্তানের নিরাপত্তার জন্য একজন অভিভাবক আর কতটা অপমান, কতটা অবহেলা সহ্য করবেন? গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় প্রথম শ্রেণির কন্যাশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক যে ঘটনা ঘটেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ভিডিওর বিষয় নয়; এটি আমাদের দেশের প্রশ্নবিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধের কঠিন পরীক্ষা।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাদ্রাসা শিক্ষক নামে যে মানুষটির কাছে শিশুটি শিক্ষা ও নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, তাঁর বিরুদ্ধেই উঠেছে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ। শিশুটি ভয়ে প্রতিষ্ঠানে যেতে চাইছিল না; ঘটনাটি প্রকাশ করলে মারধরের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও পরিবারের দাবি। ভাবা যায়...!
যে বয়সে একটি শিশুর নির্ভয়ে খেলাধুলা করার, বর্ণমালা শেখার, পৃথিবীকে বিশ্বাস করার কথা, সেই বয়সে তাকে শিখতে হচ্ছে ভয়, নীরবতা আর অবিশ্বাসের ভাষা! এর চেয়ে বড় সামাজিক লজ্জা আর কী হতে পারে? আর এটাই প্রতিনিয়ত আমাদের দেখতে হচ্ছে বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে!
ভিডিওতে একজন বাবার ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ অনেককে আলোড়িত করেছে। কেউ তাঁকে সমর্থন করছেন, কেউ প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। যারা প্রশ্ন তুলছে তাদের উদ্দেশ্যে আমি বলতে চাই- আপনি যদি ৭-৮ বছরের কন্যা সন্তানের পিতা কিংবা একটি ৭-৮ বছরের পুত্র সন্তানের পিতা বা অভিভাবক হোন, গাজীপুর কিংবা সারাদেশের মাদ্রাসায় যে সমস্ত শিশু যৌন নির্যাতন কিংবা বলৎকারের মতো ঘটনাগুলো ঘটতেছে এরকম যদি আপনার কন্যা সন্তান বা পুত্র সন্তানের সাথে ঘটে তখন আপনি বা আপনারা কি করবেন...? ঐ জঘন্য মানসিকতার লোকটাকে ধরে চুমু খাবেন, নাকি প্রতিবাদ করবেন...? এই প্রশ্ন পুরো সমাজের কাছে রাখলাম।
আমি বলতে চাই- আমাদের বিতর্কের কোলাহলে যেন আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটিকে ভুলে না যাই, মানে সেই শিশুটি, যে তার মাদ্রাসার শিক্ষকের জঘন্য মানসিকতার স্বীকার কিংবা কুনজরের শিকার হয়েছেন। পাশাপাশি আমি এটাও জানতে চাই- তাকে কে নিরাপত্তা দেবে? তার ভেঙে পড়া আস্থা কে ফিরিয়ে দেবে?
যারা মাদ্রাসার শিক্ষক পরিচয়ের আড়ালে শিশুদের বিশ্বাসকে ক্ষতবিক্ষত করে, তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়ার দায় কার?
একজন বাবার সন্তানের জন্য প্রতিবাদ করার নৈতিক অধিকার আছে, শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও আছে। সন্তানের চোখের জল দেখেও নির্বিকার থাকা অভিভাবকত্ব নয়। সেই বাবার ক্ষোভকে বুঝতে হলে নিজের সন্তানের মুখটি একবার কল্পনা করলেই যথেষ্ট। কিন্তু এটিও স্পষ্ট থাকা দরকার, থাপ্পড়টা শুধুমাত্র একদিনের কোন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, আবার এটাও মানতে হবে গণপিটুনি বিচারব্যবস্থার বিকল্প নয়। তাই গাজীপুরে ঘটে যাওয়া ঘটনা সহ সারাদেশে মাদ্রাসায় যে সমস্ত নেক্কারজনক ঘটনাগুলো ঘটতেছে প্রত্যেকটা ঘটনার ন্যায়বিচারের পথ হতে হবে, নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনের মাধ্যমে সঠিক বিচার হতে হবে। প্রতিবাদের শক্তি তখনই স্থায়ী হয়, যখন তা অপরাধের বিরুদ্ধে সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে, আরেকটি অন্যায়ের পথ খুলে দেয় না।
ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের সমাজে আস্থা ও নৈতিকতার বিশেষ স্থান দখল করে আছে। অসংখ্য সৎ ও নিবেদিত শিক্ষক সেখানে শিক্ষার্থীদের আলোকিত করছেন। তাঁদের অবদানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। প্রশ্ন তাদের নিয়ে, যারা পবিত্রতার আবরণকে ব্যক্তিগত অপরাধ ঢাকার ঢাল বানাতে চায়; প্রশ্ন সেই কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে, যারা অভিযোগ পেলে শিশুর কথা শোনার বদলে প্রতিষ্ঠানের ‘সুনাম’ রক্ষাকেই বড় করে দেখে। মনে রাখতে হবে, অপরাধ প্রকাশে প্রতিষ্ঠানের সম্মান নষ্ট হয় না; সম্মান নষ্ট হয় অপরাধ আড়াল করার চেষ্টায়। আর এই অপরাধ আড়ালের চেষ্টা এবং অপরাধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বিভিন্ন রকমের উত্তেজনা পূর্ণ বক্তব্য দিয়ে আসছে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনাকারী কিছু ঘৃণ্য মানসিকতার ব্যক্তি এবং মাদ্রাসার ঘৃণ্য মানসিকতার কিছু শিক্ষক। এ বিষয়ে আমাদের গোটা সমাজকে সচেতন হতে হবে এবং সরকার ও প্রশাসনকে কঠোরভাবে হস্তক্ষেপ এবং তদন্ত করে এদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আর কত শিশু ভয়ে মুখ বন্ধ রাখবে? আর কত মা-বাবা সন্তানের আচরণ হঠাৎ বদলে যাওয়ার কারণ বুঝতে না পেরে সময় হারাবেন? মেয়েশিশুরাই শুধু নয়, ছেলেরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে। তাই প্রতিটি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কঠোর শিশু সুরক্ষা নীতির আওতায় আনতে হবে। নির্যাতনকারীর কোনো ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা পদবি তাকে জবাবদিহি থেকে রেহাই দিতে পারে না বলে আমি মনে করি।
শুধু গ্রেপ্তার কিংবা ভাইরাল ভিডিও দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, শিক্ষক-কর্মচারীর যথাযথ যাচাই, শিশুদের উপযোগী ব্যক্তিগত সীমানা ও অনিরাপদ স্পর্শ সম্পর্কে শিক্ষা এবং অভিভাবকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর অভিযোগ শুনে তাকে দোষারোপ করা চলবে না; একাধিকবার জেরা করে মানসিক আঘাত বাড়ানোও চলবে না। প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পেশাজীবীর সহায়তা, পরিচয় গোপন রাখা এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া।
রাষ্ট্রের কাছেও আমার প্রশ্ন আছে। অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত কত দ্রুত শুরু হয়? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা খতিয়ে দেখা হয় কি? শিশুটির মানসিক সুস্থতার দায় কে নেয়? বিচার দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে গেলে অপরাধীরা সাহস পায়, আর ভুক্তভোগী শেখে, সত্য বলেও হয়তো কিছু বদলায় না। এই বার্তা একটি সভ্য রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীর আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কারও অবহেলা বা অপরাধ আড়াল করার প্রমাণ থাকলে তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
এখানে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও একটি বড় দায় আছে। প্রতিবাদের নামে যেন শিশুটির নাম, ছবি, পরিচয় কিংবা তার অভিজ্ঞতার বিবরণ ছড়িয়ে না পড়ে। অপরাধের অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভুক্তভোগীকেই দ্বিতীয়বার ক্ষতিগ্রস্ত করার অধিকার কারও নেই। ভিডিওর দৃশ্য যত দ্রুত ছড়ায়, শিশুর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তত দ্রুত ছড়ায় কি? আমরা কি তার মানসিক সহায়তা, নিরাপদ শিক্ষাজীবন ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রশ্নে সমান সরব? অভিভাবকদেরও ঘরে ঘরে সচেতনতার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। সন্তান হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে, মাদ্রাসার কোনো শিক্ষককে অস্বাভাবিক ভয় পেলে কিংবা মাদ্রাসায় যেতে না চাইলে তাকে ধমক নয়, সময় দিন। শিশুকে জানান, অন্যায়ের কথা বললে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। তার কথা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দিন। সন্তান যেন জানে, তার প্রথম নিরাপদ আশ্রয় তার পরিবার।
আমাদের সামাজিক অভ্যাসও বদলাতে হবে। শিশুর শরীর তার নিজের; শিক্ষক, আত্মীয় কিংবা পরিচিত কেউ তার শারীরিক সীমানা লঙ্ঘন করার অধিকার রাখেন না। শিশুর মুখে অস্বস্তির কথা শুনে ‘এটা কিছু নয়’ বলার দিন শেষ। শিশুকে বিশ্বাস করতে হবে, মন দিয়ে শুনতে হবে, নিরাপদে রাখতে হবে। যে সমাজ শিশুর কান্না উপেক্ষা করে, সে সমাজ ধর্মের কথা বললেও নৈতিকতার পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়।
গাজীপুরের সেই থাপ্পড় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত নয় আঘাতের দৃশ্য; থাকা উচিত সেই মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা, যে শিক্ষাব্যবস্থায় একটি শিশুকে তার নিরাপত্তার জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে হয়। একটি থাপ্পড় হয়তো মুহূর্তের জন্য কাউকে চমকে দেয়। কিন্তু সমাজের টনক নড়বে তখনই, যখন বলাৎকার কিংবা শিশু নির্যাতনের প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্ব পাবে, প্রতিটি শিশু নিরাপদ থাকবে এবং প্রতিটি অপরাধের নিরপেক্ষ বিচার হবে।
সবশেষে আমার প্রশ্ন একটাই- আমরা কি শুধু ভিডিও দেখে উত্তেজিত হব, নাকি শিশুদের জন্য এমন বাংলাদেশ গড়ব, যেখানে একজন বাবাকে সন্তানের নিরাপত্তার দাবিতে আর কখনো অসহায় ক্রোধে ফেটে পড়তে হবে না?
লেখক: প্রদীপ্ত মোবারক, কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
মূল প্রতিবেদনে যান ↗