সত্যিকার অর্থে দারিদ্র্য মানুষের জীবনের এক কঠিন বাস্তবতা। জীবিকার কোনো উপায় না থাকলে কিংবা বয়সের ভার, শারীরিক অক্ষমতা বা অন্য কোনো কারণে কাজ করতে না পারলে অনেক মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হয়ে অন্যের কাছে হাত পাতেন।
এভাবেই অনেক অসহায় মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়েন। সমাজের এমন অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানবিক দায়িত্ব। কিন্তু ভিক্ষাবৃত্তির চিত্রটি সব ক্ষেত্রে এতটা সহজ বা স্বাভাবিক নয়। আজকাল দেখা যায়, প্রকৃত প্রয়োজনের পাশাপাশি ভিক্ষাবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের প্রতারণা। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের সামাজিক দায়িত্ব, মানবিকতা, ধর্মীয় অনুভূতি ও সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণামূলকভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। ফলে ভিক্ষাবৃত্তি কখনো কখনো শুধু দারিদ্র্যের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং প্রতারণারও একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে। এটাই আজ আমাদের সমাজে এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আমাদের শহর, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, যানজটপূর্ণ সড়কের মোড়, মসজিদ ও বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আশপাশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে ভিক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে অনেকেই সত্যিই অসহায় থাকেন। কিন্তু অনেকের ভিক্ষার পেছনে প্রকৃত প্রয়োজন কতটা বিদ্যমান, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে। কেউ নিজের শারীরিক অক্ষমতার কথা বলে অর্থ চান, কেউ অসুস্থতার গল্প শোনান, কেউ আবার সন্তান বা পরিবারের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেন। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত অসহায়ত্ব আর সাজানো অসহায়ত্বের পার্থক্য করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ নিজের মানবিকতা দিয়ে এসব সাহায্যপ্রার্থীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করেন। মানুষের এই মানবিকতাকে পুঁজি করে সমাজে ভিক্ষাবৃত্তি যেন দিন দিন বেড়েই চলেছে।
ভিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের মানবিক অনুভূতি। একজন অসহায় মানুষকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে দয়া জাগে। এই দয়াকেই যখন কেউ পরিকল্পিতভাবে অর্থ উপার্জনের উপায় হিসেবে ব্যবহার করেন, তখন বিষয়টি আর নিছক ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মিথ্যা পরিচয়, বানানো কাহিনি, কৃত্রিম অসুস্থতা কিংবা শারীরিক অক্ষমতার অভিনয় করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা মানুষের সরল বিশ্বাসের অপব্যবহার ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তিকে প্রতারিত করে না, প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের প্রতিও মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। এর ফলে প্রকৃত অভাবী বা দরিদ্র ব্যক্তিরা প্রয়োজনের মুহূর্তে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোনো সহায়তা পায় না।
বিশেষ করে শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনেক সময় ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে, শিশুকে সামনে বসিয়ে কিংবা শিশুর অসুস্থতার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ চাওয়া হয়। শিশুটি সত্যিই অসুস্থ কি না, সে ওই ব্যক্তির সন্তান কি না, কিংবা তাকে কোনো সংগঠিত চক্র ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করছে কি না, এসব প্রশ্নও সামনে আসে। একটি শিশুকে শিক্ষা ও স্বাভাবিক শৈশব থেকে দূরে রেখে মানুষের সহানুভূতি আদায়ের উপকরণে পরিণত করা শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি শিশুর ভবিষ্যতের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এসব দিক এখন গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে।
ভিক্ষাবৃত্তির ক্ষেত্রে ধর্মীয় অনুভূতির সুযোগ নেওয়ার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। রমজান মাস, ঈদ, জুমার দিন কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের দান ও সাহায্যের প্রবণতা বেড়ে যায়। এ সময় প্রকৃত দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি এমন কিছু মানুষও সক্রিয় হয়ে ওঠেন, যারা মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও দানের মানসিকতাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেন। ফলে দান করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না, তিনি সত্যিকার অর্থে একজন অসহায় মানুষকে সাহায্য করছেন, নাকি কোনো প্রতারণামূলক ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করছেন। এমনও দেখা যায়, কোনো কোনো ভিক্ষুক অন্যের কাছ থেকে চেয়ে টাকা নিয়ে ধুমপানে লিপ্ত হচ্ছেন, অনেকেই ভিক্ষার টাকা দিয়ে পানসুপারি, জর্দা খাচ্ছেন চোখেমুখে অনেক প্রশান্তি নিয়ে! অথচ ভিক্ষুককে আর্থিক সাহায্য করা হয় তার খেয়েপরে বেঁচে থাকার জন্য, নেশা করার জন্য নয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে এটাও এক ধরনের প্রতারণা।
তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, সব ভিক্ষুককে প্রতারক হিসেবে দেখা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত নয়। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাদের জীবনে ভিক্ষা করা ছাড়া বাস্তবিকই আর কোনো উপায় থাকে না। বার্ধক্য, শারীরিক অক্ষমতা, কর্মসংস্থানের অভাব, পারিবারিক বিপর্যয় কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি তাদের ভিক্ষাবৃত্তিতে ঠেলে দিতে পারে। এসব ক্ষেত্রে তাদের প্রতি অবজ্ঞা নয়, প্রয়োজন মানবিক সহায়তা। আলোচ্য ক্ষেত্রে সমস্যাটি সৃষ্টি হয় তাদের নিয়ে, যারা প্রকৃত অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিকে প্রতারণার হাতিয়ার বানাচ্ছেন।
ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে প্রতারণা বন্ধ করতে হলে শুধু ভিক্ষুকদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকৃত অসহায় মানুষকে শনাক্ত করে তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার, মিথ্যা পরিচয় বা অসুস্থতার অভিনয় এবং সংগঠিতভাবে মানুষকে ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহের মতো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। মানুষের সহানুভূতি বন্ধ করা নয়, বরং সেই সহানুভূতিকে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
‘মানুষ মানুষের জন্য’, এই মানবিক বোধ আমাদের সমাজের অন্যতম বড় শক্তি। কিন্তু সেই মানবিকতাকে যদি কেউ প্রতারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে একসময় প্রকৃত অসহায় মানুষের প্রতিও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রকৃত দরিদ্র মানুষ সহায়তা পাবেন, কিন্তু প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের সহানুভূতি ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। ভিক্ষাবৃত্তির সমস্যার সমাধান শুধু ভিক্ষা বন্ধ করা নয়; বরং দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের প্রকৃত কারণ দূর করা এবং একই সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে থাকা প্রতারণাকে চিহ্নিত করাও জরুরি।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অধ্যক্ষ।
The post ভিক্ষাবৃত্তির আড়ালে কতটা প্রতারণা? appeared first on Dhaka Protidin.
