সুফলভোগীরা জানান, ওএমএসে জনপ্রতি পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা দেয়া হয়। কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে চাল ও ২৪ টাকা দরে আটা কিনতে ডিলারের দোকানের সামনে ভোর থেকেই হতদরিদ্রদের লাইনের সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘ ১৬ বছরেও ফেনী পৌরসভায় বাড়েনি খোলা বাজারের পণ্য (ওএমএস) বিক্রয় কেন্দ্র। ফলে পর্যাপ্ত কেন্দ্রের অভাবে কম দামে ওমএসের চাল-আটা কিনতে না পেরে সরকারি এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন লাখো পৌরবাসী। বিশেষ করে শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ সরকার নির্ধারিত মূল্যে এসব পণ্য কিনতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। অভিযোগ রয়েছে, পাশের জেলা নোয়াখালী, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বারবার ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্র বাড়িয়ে পর্যাপ্ত করা হয়েছে। তবে ফেনীর প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের প্রচেষ্টা না থাকায় জেলায় এর কেন্দ্র বাড়ানো যায়নি। তবে ফেনীতে ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্র বাড়ানোর জন্য শিগগিরই ঊর্ধ্বতনদের লিখিতভাবে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালে ফেনী পৌরসভার ১৮ ওয়ার্ডে ছয়টি বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে ওএমএস কার্যক্রম চালু করে সরকার। ওয়ার্ডের তুলনায় বিক্রয় কেন্দ্র কম থাকায় সপ্তাহে দুই-তিনদিনের বেশি ওএমএস চালু রাখা সম্ভব হয় না। ১৬ বছরে জনসংখ্যার সঙ্গে এর চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়লেও এখনো সেই ছয়টি বিক্রয় কেন্দ্রই রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী ওএমএসের সুফল পাচ্ছেন না ফেনীর ভোক্তারা।
জানা গেছে, ফেনীর পার্শ্ববর্তী কুমিল্লায় দফায় দফায় বিক্রয় কেন্দ্র বাড়িয়ে ৩২টিতে উন্নীত হয়েছে। নোয়াখালীতে ১৭টি, চাঁদপুরে ১৫টি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১২টি বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ফেনীতে ভাসমান, ছিন্নমূল, শ্রমজীবী ও হতদরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়লেও ওএমএসের বিক্রয় কেন্দ্র এ দীর্ঘ সময়েও ছয়টি অতিক্রম করতে পারেনি।
সুফলভোগীরা জানান, ওএমএসে জনপ্রতি পাঁচ কেজি চাল ও পাঁচ কেজি আটা দেয়া হয়। কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে চাল ও ২৪ টাকা দরে আটা কিনতে ডিলারের দোকানের সামনে ভোর থেকেই হতদরিদ্রদের লাইনের সৃষ্টি হয়। তারা কোনো সপ্তাহে একদিন আবার কোনো সপ্তাহে দুইদিন পান সরকারি এ চাল-আটা। বরাদ্দ কম থাকায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় অনেকের।
ফেনী পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের বিক্রয় কেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী মো. আকবর হোসেন বলেন, ‘আমি কোনো সপ্তাহে দুইদিন, কোনো সপ্তাহে তিনদিন ওএমএস পাই। প্রতি বরাদ্দে ৭৫০ কেজি চাল ও ৭৫০ কেজি আটা দেয়া হয়। সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বিক্রয় শুরু করে দুপুর পর্যন্ত চলে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষ ওএমএসের চাল ও আটা সংগ্রহ করে থাকে।’
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০১০ সালে ওএমএস চালুর সময় ফেনী পৌরসভার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৯২ হাজার। ওই সময়ে ছয়টি কেন্দ্রে ওএমএস পরিচালনা করা হতো। বর্তমানে ফেনী পৌরসভায় বসতি বেড়ে মানুষের সংখ্যা ২ লাখ ৭৮ হাজারে দাঁড়িয়েছে। এর বাইরে ফেনীতে স্টার লাইন গ্রুপের ১৭টি শিল্প-কারখানা, আবুল খায়ের ম্যাচ ফ্যাক্টরি, কোয়ালিটি জুট মিলসসহ বিভিন্ন কলকারখানায় হাজার হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। নিম্ন আয়ের এসব ব্যক্তির জন্য সরকার এ কর্মসূচি চালু রাখলেও পর্যাপ্ত বিক্রয় কেন্দ্র ও বরাদ্দ না থাকায় ফেনীর মানুষ এর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
ফেনী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আলাউদ্দিন ঢালী বলেন, ‘ফেনী পৌরসভায় ১৮টি ওয়ার্ড হলেও এখানে ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্র রয়েছে ছয়টি। একদিন ১-৬ নং ওয়ার্ডে ওএমএস চালু রাখলে পরের দিন ৭ থেকে ১২ নং ওয়ার্ডে ওএমএস পাওয়া যায়। এভাবে আমরা এক ওয়ার্ডে ওএমএস বন্ধ রেখে আরেক ওয়ার্ডে ওএমএস চালু রাখি।’
তিনি আরো বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জেলায় দৈনিক তিন টন চাল ও আটা ট্রাক সেলের মাধ্যমে দরিদ্রদের কাছে পৌঁছানোর বরাদ্দ থাকলেও ফেনীতে ট্রাক সেলের কোনো বরাদ্দ নেই। ফলে এখানে ওএমএসের বাড়তি চাহিদা থাকে। ফেনীতে ওএমএসের বরাদ্দ ও বিক্রয় কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং ট্রাক সেল চালুর বিষয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি।’
ফেনী জেলা ওএমএস কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, ‘দেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় ফেনীতে শ্রমজীবী ও দরিদ্র-হতদরিদ্রের সংখ্যা কম নয়। অন্যান্য জেলার মানুষও এখানে কাজের সন্ধানে আসে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখানে প্রায় দেড় দশকেও ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্র বাড়ানো হয়নি। দরিদ্র মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করে বাজারে চাল ও আটার দাম স্থিতিশীল করতে ফেনীতে ওএমএস বিক্রয় কেন্দ্র ও বরাদ্দ বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে জানিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে।’
