সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও শক্তি। এই ঐতিহ্য নষ্টের যেকোনো অপচেষ্টা সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
তিনি বলেন, কোনো অশুভ শক্তিকে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে দেওয়া হবে না। আগামী প্রজন্মের জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য অটুট রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার শ্রীশ্রী জগন্নাথ মন্দিরে মহাষষ্ঠী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন জেলা প্রশাসক। এর আগে তিনি রাউজানের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এক দিনে গড়ে ওঠেনি। শত শত বছর ধরে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে এই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘উৎসব কখনো একা করা যায় না, উৎসব হয় সবার’—উল্লেখ করে তিনি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের আহ্বান জানান।
এবারের দুর্গাপূজায় মানুষের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি এবং চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি নতুন সর্বজনীন পূজামণ্ডপ হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে মণ্ডপগুলোতে সরকারি সহায়তাও বাড়ানো হয়েছে বলে জানান তিনি।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে জেলা প্রশাসক রাউজানের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় আনসার, র্যাব ও ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যদের অংশগ্রহণে যৌথ নিরাপত্তা মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। তিনি হলদিয়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেরা এলাকায় অবস্থিত জানিপাথর সর্বজনীন দুর্গামন্দিরসহ কয়েকটি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরে এর আগে কোনো জেলা প্রশাসক পরিদর্শনে যাননি।
সফরকালে জেলা প্রশাসক রামদয়াল মাঝির বাড়ি দুর্গামন্দির, ডাবুয়া কাকলী সংঘ এবং ঢেউয়াপাড়ার জগন্নাথবাড়ি দুর্গামন্দির পরিদর্শন করেন। এ সময় দুটি পূজামণ্ডপে আর্থিক সহায়তা দেন তিনি। পাশাপাশি সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত তিনটি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, গত বুধবার রাতে দুটি বাড়িতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত কোনো বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়নি। কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, সোমবার ও বুধবারের অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মামলা হয়েছে। জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। দ্রুত তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে এবার ২ হাজার ৫৯৩টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নিরাপত্তায় প্রায় সাড়ে ১২ হাজার আনসার সদস্য ও পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত জানাতে পূজা উদ্যাপন কমিটিগুলোর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও খোলা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আনসার ও ভিডিপির জেলা কমান্ড্যান্ট মো. সেফাউল হোসেন বলেন, দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আনসার সদস্যরা সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকবেন।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি রয়েছে। এ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
জেলা প্রশাসকের সফরসঙ্গী ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রাহাতুল ইসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা।
এই বাংলা/এমএস
