বাগেরহাটে গলদা চিংড়ির রেণু সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার চাষি। জেলার ৫৪ হাজারেরও বেশি ঘেরে প্রতি বছর ৫৮ কোটি ৬০ লাখ রেণুর বিশাল চাহিদা থাকলেও, স্থানীয় হ্যাচারিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।
বিজ্ঞাপন
সংকট আরো তীব্র রূপ নিয়েছে সরকারি ও বেসরকারি ৯টি হ্যাচারির মধ্যে চারটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকার ফলে, ভরা মৌসুমেও প্রয়োজনীয় রেণু না পেয়ে চাষিরা আড়তে আড়তে ঘুরছেন। একদিকে চড়া দাম ও বাড়তি যাতায়াত খরচ, অন্যদিকে সময়মতো পোনা ছাড়তে না পারায় বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। উপকূলের এই সাদা সোনা রক্ষায় অবিলম্বে বন্ধ হ্যাচারিগুলো চালুর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চাষিরা।
স্থানীয় মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট জেলায় বর্তমানে ৫৪ হাজার ৮৪৮টি গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। এসব ঘেরে প্রতি বছর প্রায় ৫৮ কোটি ৬০ লাখ রেণুর প্রয়োজন হয়। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলোÑ বর্তমানে সচল স্থানীয় হ্যাচারিগুলো থেকে উৎপাদিত রেণু দিয়ে মোট চাহিদার মাত্র ৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি ৯৬ শতাংশ চাহিদাই অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে কিংবা ভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
বাগেরহাট সদর উপজেলার খানপুর এলাকার চিংড়িচাষি বোরহান মল্লিক তার আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আমি চিংড়ি চাষ করছি। কিন্তু এবারের মতো সংকটে কখনো পড়িনি। বছরের শুরুতে ধারদেনা করে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছিলাম, কিন্তু ভাইরাসের মড়কে সব শেষ হয়ে যায়। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার ১০০ বিঘার ঘেরে দেড় লাখ গলদা রেণু ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু পাঁচ-সাতবার আড়তে গিয়েও একসঙ্গে পোনা পাইনি। ভেঙে ভেঙে ১০-১৫ হাজার করে বেশি দামে কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।’
একই পরিস্থিতি পাশের চাকশ্রী গ্রামের চাষি বদিউজ্জামানেরও। এপ্রিল থেকে জুন মাস গলদার রেণু ছাড়ার উপযুক্ত সময় হলেও, মৌসুমের শেষ দিকে এসেও তিনি প্রয়োজনীয় পোনা সংগ্রহ করতে পারেননি।
সরেজমিনে বাগেরহাট-খুলনা মহাসড়কের ফুলবাড়ী এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্র্যাক হ্যাচারিটি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এর চারপাশ ঝোপঝাড়ে ছেয়ে গেছে, নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি। একই দশা বাগেরহাট প্রন হ্যাচারি এবং মোরেলগঞ্জের রূপা গলদা হ্যাচারির। লোকসানের মুখে পড়ে হ্যাচারিগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানান বন্ধ একটি হ্যাচারির দায়িত্বরত কর্মী রহিম গাজী।
বাগেরহাট চিংড়িচাষি সমিতির সভাপতি ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘বাস্তবে রেণুর চাহিদা সরকারি হিসেবের চেয়েও বেশি। বন্ধ বেসরকারি হ্যাচারিগুলো জরুরি ভিত্তিতে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সচল করা না গেলে এই শিল্প টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজ কুমার বিশ্বাস জানান, জেলার ৯টি হ্যাচারির মধ্যে পাঁচটি চালু এবং চারটি বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হ্যাচারিগুলো চালু থাকলে চাহিদার অন্তত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব হতো। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা বন্ধ হ্যাচারিগুলোর মালিকদের লাইসেন্স নবায়ন করে কার্যক্রম শুরু করতে বারবার চিঠি দিয়েছি। কিন্তু কোনো সাড়া না পাওয়ায় তাদের লাইসেন্স বাতিলের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’
