হেমন্তের শিশিরভেজা সকাল, আমনখেতে সোনালি আভা, সমতলের চা-বাগানে পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত শ্রমিক আর সীমান্তঘেঁষা জনপদের নির্মল প্রকৃতি—সব মিলিয়ে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হিমালয়কন্যাখ্যাত পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। পূজার দীর্ঘ ছুটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ছুটে এসেছেন উত্তরের এই জনপদে। তবে প্রকৃতির এত আয়োজনের মধ্যেও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত তুষারাবৃত পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার। মেঘের আড়ালে ঢাকা থাকায় অনেক পর্যটককে ফিরতে হচ্ছে সেই আক্ষেপ নিয়েই।
সাপ্তাহিক ছুটিসহ টানা কয়েক দিনের অবকাশে পরিবার-পরিজন নিয়ে তেঁতুলিয়ায় আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো এলাকায় জড়ো হচ্ছেন অনেকে। সবার প্রত্যাশা, মেঘের আড়াল সরিয়ে একবারের জন্য হলেও দেখা দেবে হিমালয়ের মনোমুগ্ধকর শৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা না মিললেও প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে নিরাশ হচ্ছেন না পর্যটকেরা। কেউ ঘুরে দেখছেন বিস্তীর্ণ সমতলের চা-বাগান, কেউ উপভোগ করছেন মহানন্দা নদীর সৌন্দর্য। আবার কেউ মুগ্ধ হচ্ছেন সীমান্তঘেঁষা গ্রামের শান্ত পরিবেশে। আকাশে মেঘের সামান্য ফাঁক দেখা দিলেই ক্যামেরা ও মুঠোফোন নিয়ে ছবি তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অনেকে।
রাজধানী ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রুপম ও নীলফামারীর আতিক ওয়াদুদ জানান, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার আশায় তাঁরা পঞ্চগড়ে এসেছেন। কিন্তু আকাশ মেঘে ঢাকা থাকায় সেই আশা পূরণ হয়নি। তবে তেঁতুলিয়ার শান্ত পরিবেশ, রাতে ডাকবাংলো এলাকার সৌন্দর্য এবং মহানন্দা নদীর মনোরম দৃশ্য তাঁদের ভালো লেগেছে।
তাঁরা আরও ঘুরে দেখেছেন বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, সমতলের চা-বাগান, আনন্দধারা, বড়বিল্লাহ এবং সীমান্তবর্তী দর্জিপাড়া, কাজীপাড়া ও শারিয়ালজোত গ্রাম। ফেরার পথে পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়াম, ঐতিহাসিক মহারাজার দিঘি, আটোয়ারীর মির্জাপুর শাহী মসজিদ ও বোদার বোদেশ্বরী মন্দির ঘুরে দেখার সুযোগও হয়েছে তাঁদের।
পর্যটকদের আগমনে তেঁতুলিয়ার পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রাণ ফিরেছে। হোটেল, রিসোর্ট ও হোমস্টেগুলোতে থাকার জায়গা পেতে অনেককে বেগ পেতে হচ্ছে। খাবারের হোটেল, চায়ের দোকান ও স্থানীয় পরিবহনসেবায় বেড়েছে ব্যস্ততা। পর্যটকদের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যেতে অটোরিকশা ও ভ্যানচালকদেরও ব্যস্ত সময় কাটছে। পর্যটন মৌসুমকে ঘিরে বাড়তি আয়ের প্রত্যাশা করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানান, বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে মেঘ ও কুয়াশার উপস্থিতির কারণে কাঞ্চনজঙ্ঘা দৃশ্যমান হচ্ছে না। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে আবহাওয়ার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নিচের স্তরে কুয়াশা থাকলেও ওপরের মেঘ সরে গেলে দিনের কিছু সময়ের জন্য পর্বতশৃঙ্গটি দেখা যেতে পারে। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে তেঁতুলিয়ায় আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তৎপর রয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন জানান, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করা এবং হয়রানি ও অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে রিসোর্ট ও গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
কাঞ্চনজঙ্ঘা আপাতত মেঘের আড়ালে থাকলেও তেঁতুলিয়ার প্রকৃতি, চা-বাগান, নদী আর সীমান্তঘেঁষা জনপদের সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রেখেছে। কাঙ্ক্ষিত পর্বতশৃঙ্গের দেখা পাওয়ার অপেক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতির সান্নিধ্য উপভোগ করেই ফিরছেন অনেকে।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব
