২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় সংশোধিত ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা, যা প্রায় ১০৯ শতাংশ বেশি। এখন প্রকল্পটি বাতিল করে এর অবকাঠামো সরিয়ে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র?্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের এক পত্রে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে জানাতে হবে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। ২০২৫ সালে প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা ছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রস্তাবটি অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প খোঁজা এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত ব্যয় হওয়া ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকার বিপরীতে প্রকল্প থেকে বিশেষ বাসসেবা পাওয়া যায়নি। ফলে ব্যয় করা অর্থের কাঙ্ক্ষিত সুফল অধরাই রয়ে গেছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। বিআরটি চালুর ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল বাসের দরজার অবস্থান। বাংলাদেশে চলাচলকারী অধিকাংশ বাসের দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি স্টেশনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে বাসের দরজা থাকতে হবে ডান দিকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিআরটি ব্যবস্থায় সাধারণত ডান দিকের দরজাবিশিষ্ট বাস ব্যবহার করা হয়। ফলে এ ব্যবস্থার উপযোগী বাস চালু করা হলেও সেগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডরের বাইরে সাধারণ সড়কে চলাচল করতে পারত না।
অপচয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন : প্রকল্প বাতিলের ফলে কত টাকা অপচয় হবে, তার চূড়ান্ত হিসাব এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে নির্মিত অবকাঠামো অপসারণ ও সড়ক পুনর্বিন্যাসে নতুন করে অর্থ ব্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) হিসাবে, স্টেশন, র?্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি লাগতে পারে। অন্যদিকে, বিশেষ বাস কিনে প্রকল্প চালু করতে গেলে আরও প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। কয়েকটি পদচারী-সেতুতে লিফট ও চলন্ত সিঁড়ি থাকলেও সেগুলোর অনেকগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও কিছু জায়গায় লোহার বেড়া বসানো হয়েছে। এতে সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে এসব স্থাপনার অনেকগুলো অপসারণ করতে হবে।
পরিকল্পনার ব্যর্থতায় ১৪ বছরের ভোগান্তি : বিআরটি প্রকল্পের কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করেছিল। অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে দলটি গত বছরের অক্টোবরে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশার ঘাটতি, পয়ঃনিষ্কাশনব্যবস্থার অভাব, সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনা না থাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে এ পরিস্থিতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র?্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। বিশেষ বাস কেনা না হওয়ায় তাদের কার্যক্রম সীমিত রয়েছে। এখন কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে সওজের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই সড়ক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন। নির্মাণকাজ চলাকালে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা নির্মাণকাজে যানজট ও জনদুর্ভোগ বেড়েছে। এখন অসমাপ্ত স্টেশন সরিয়ে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণ এবং উড়ালসড়ক সম্প্রসারণ করতে হবে।
প্রকল্প বাতিলের প্রতিবাদ বিআইপির : বিআরটি প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে বিআইপি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান স্বাক্ষরিত ২০ অক্টোবরের প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি নিয়ে ‘সবচেয়ে খারাপ বিকল্পটি’ বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিআইপির দাবি, এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকারী ও নির্মাণ খাতের স্বার্থকে সুবিধা দিয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বার্থের সংঘাত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে সংগঠনটি। তাদের মতে, প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত গাজীপুর ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান এবং ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনার পরিপন্থি। গত ১৪ বছর নির্মাণকাজের কারণে দুর্ভোগ পোহানো গাজীপুর ও উত্তরার বাসিন্দাদের চলাচলের চাহিদার প্রতিও এ সিদ্ধান্ত সুবিচার করে না।
